আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম


আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম  ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট-এর আওতায় নিবন্ধিত একটি সেবামূলক, অমুনাফামুখী ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। একজন সুরাটি ব্যবসায়ী শেঠ ইব্রাহিম মুহাম্মদ ডুপ্লে কর্তৃক ১৯০৫ সালে কলকাতায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম  প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান ও অন্যান্যদের বেওয়ারিশ লাশ সংগ্রহ ও দাফন করা।

দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭), আঞ্জুমান-এর অফিস ঢাকায় স্থাপন করা হয় ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ক্রমে প্রতিষ্ঠানটি হাবিবুল্লাহ বাহার, আব্দুর রহমান চৌধুরী, বিচারপতি হামদুর রহমান, এ বি এম জি কিবরীয় প্রমুখদের নেতৃত্বে সেবামূলক কর্মকান্ডের নতুন নতুন কার্যক্রম গ্রহন করতে থাকে।

আঞ্জুমান-এর ব্যবস্থাপনার কাজ ‘জেনারেল কাউন্সিল’ নামের একটি বর্ধিত শাখা কর্তৃক পরিচালিত হয়। অনুমোদিত শাখাসমূহের সকল জীবন সদস্য, সাধারণ সদস্য ও মনোনীত সদস্যদের নিয়ে জেনারেল কাউন্সিল গঠিত হয়। জেনারেল কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ কাউন্সিলের সভাপতি, বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য, দশজন সহ-সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য নির্বাচিত করে থাকে। কমিটির প্রধান কর্তব্যসমূহ হল প্রতিষ্ঠানের সংবিধান-এর ধারাসমূহ কাঠামোগত প্রক্রিয়ায় আনা, বাৎসরিক প্রতিবেদন প্রস্ত্তত করা, নতুন নতুন প্রস্তাবনার অবতারণা করা, ইত্যাদি এবং প্রস্তাব সমূহ বিবেচনা করার জন্য কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করা। দশ জন সহসভাপতির পদমর্যাদার ট্রাস্টির সমন্বয়ে এ প্রতিষ্ঠানের একটি বোর্ড অব ট্রাস্টি রয়েছে। এই ট্রাস্টি বোর্ডই আঞ্জুমানের সকল স্থাবর, অবস্থাবর-সম্পত্তির জিম্মাদার। আঞ্জুমান-এর সভাপতিই এ ট্রাস্টি বোর্ড এর চেয়ারম্যান।

ব্যবস্থাপনা কমিটি হল আঞ্জুমান-এর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যনির্বাহী অংশ যারা প্রতিমাসে একবার একত্রে মিলিত হয়ে সার্বিক কাজ পর্যালোচনা করে থাকেন। সভাপতিকে প্রধান করে দশজন ট্রাস্টি ও দশজন সহসভাপতিসহ মোট ৭৮ জন সদস্য নিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির গঠিত। আঞ্জুমানের এই ব্যবস্থাপনা কমিটিই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও বিধেয় নির্ধারণ ও সংগঠনের নীতি ও অনুষ্ঠানসমূহ সূত্রবদ্ধ করে থাকে। তাছড়াও বছরের বাজেট অনুমোদন সহ এর কর্মপরিকল্পনাসমূহকে কার্যকরী করা ও তা তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এ কমিটি। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনানুসারে ব্যবস্থাপনা কমিটি অন্যান্য উপ-কমিটিও গঠন করে থাকে। কমিটিসমূহ নিয়মিতভাবে মিলিত হয়ে সংগঠনের কাজ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়সমূহ আলোচনা ও অনুমোদন করে থাকে।

একজন নির্বাহী পরিচালক আঞ্জুমান-এর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। নির্বাহী পরিচালকের দপ্তর একজন ডেপুটি নির্বাহী পরিচালক, সহকারী পরিচালক, অফিসার ও অন্যান্য অফিস সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত হয়। বাংলাদেশের ৪৩টি জেলায় আঞ্জুমান-এর অনুমোদিত শাখা রয়েছে। শাখাসমূহের তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে এবং এ কমিটি তাদের কাজের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির নিকট দায়বদ্ধ থাকে।

আঞ্জুমান-এর কার্যক্রম-এর মধ্যে অন্যতম হল বেওয়ারিশ ও নিঃস্বদের লাশ বহন ও দাফন করা।

গত তিন অর্থ বছরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম-এর এ্যাম্বুলেন্স যে পরিমাণ বেওয়ারিশ লাশ, অন্যান্য লাশ এবং বিনা খরচে রোগী পরিবহন করেছে, (ঢাকা ও ঢাকার বাইরে) তা নিম্নরূপ (সারণি ১)

সন বেওয়ারিশ লাশ হস্তান্তর (বিনা খরচে) লাশ বহন বিনা খরচে (সংখ্যায়) শহরের বাইরে অর্থ সাহায্যে লাশ বহন (সংখ্যায়) শহরের ভিতরে বিনা খরচে রোগী পরিবহন (সংখ্যায়) শহরের বাইরে রোগী পরিবহন (অর্থ সাহায্যে) সংখ্যায় এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে অর্থসাহায্য গ্রহণ
২০০৬-২০০৭ ২২০৩ ৭৩২ ৬৮০ ৬১২৬ ৪৯৮ ১৪৬০২০০টাকা
২০০৭-২০০৮ ২১১৯ ৯২৮ ৭৬২ ৬২৫০ ৪৮৪ ১৪৪৫১১০টাকা
২০০৮-২০০৯ ২২৪৩ ৮৬৮ ৭৫৫ ৬২১৬ ৫৩৫ ১৫৯৬২২০টাকা

আঞ্জুমানের ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে বা ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় শিতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে বিনা খরচে রোগী ও লাশ (সকল ধর্মাবলম্বীদের জন্য) পরিবহনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রোগী ও লাশ পরিবহন করে থাকে আঞ্জুমান। আঞ্জুমানের প্রধান শাখায় ও কাকরাইলের শাখায় একটি ‘দাফন সেবা’ কার্যক্রম রয়েছে যার মাধ্যমে লাশ-এর গোসল, কাফনের কাপড়, কফিন বাক্স প্রভৃতির ব্যবস্থা করা ও এ সংক্রান্ত সেবা প্রদান করা হয়।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম এর অধীনে তিনটি এতিমখানা পরিচালিত হয়। পাঁচ-সাত বছর বয়সী এতিম শিশুরা এখানে ভর্তি হতে পারে ও ষোল বছর পর্যন্ত এখানে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষা প্রদান করা হয়। এতিমখানায় অবস্থানের সময় শেষ হলে তাদেরকে, বিশেষ করে মেয়েদেরকে ভবিষ্যতে নিজেদের ব্যায় নির্বাহের জন্য আয়ের উৎসের ব্যবস্থা করতে প্রয়োজন অনুযায়ী একটা করে শেলাই মেশিন ও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। তাছাড়াও, এতিম মেয়েদের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্যও প্রদান করা হয়। উপরন্তু, যে শিশু পরবর্তীতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে তার পড়াশুনার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার আঞ্জুমান বহন করে থাকে। এতিমদের কারিগরি শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে আঞ্জুমান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় একটি টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটও চালু করেছে। আঞ্জুমান অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল দরিদ্র ছেলেমেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য একটি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ও পরিচালনা করে থাকে। শীতকালে আঞ্জুমান ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ৪৩টি শাখার মাধ্যমে দরিদ্রদের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণের ব্যবস্থা করে থাকে। আঞ্জুমান ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ‘আঞ্জুমান বার্তা’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা এবং ২০০১-এর ১ জুলাই থেকে ‘Anjuman News’  নামের ইংরেজি বুলেটিন প্রকাশ করে আসছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম এর আয়ের উৎসসমূহ হলো: মঞ্জুরী, অনুদান, বৃত্তি, যাকাত ফান্ড, সাধারণ ফান্ড, কোরবানীর পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ, শব-ই-বরাত রাতে সংগৃহীত অর্থ, ট্রাস্ট ফান্ড, দানকৃত বাড়ির ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রভৃতি।

গত তিন অর্থ বছরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম-এর আয় ও ব্যায়ের হিসাব:(সারণি-২)

অর্থ বছর আয় (টাকা) ব্যয় (টাকা) ব্যয়ের পর অতিরিক্ত অর্থ (টাকা)
২০০৬-২০০৭ ৩০৬০০৮৪৯/= ২০০৪৫৩৫৯/= ১০৫৫৫৪৯০/=
২০০৭-২০০৮ ৩৪২০৩২৮১/= ২০৮৪৭৪৭৯/= ১৩৩৫৫৮০২/=
২০০৮-২০০৯ ৪১২১২৫৪৩/= ৩০৩৮২১৫৭/= ১০৮৩০৩৮৬/=

সম্প্রতি আঞ্জুমান ঢাকা ও অন্যান্য শহরে জমি, দালান, ফ্ল্যাট, দোকান প্রভৃতির আকারে সম্পত্তি অর্জন করেছে। কল্যাণকামী দাতাগণই এ সব দানের অধিকাংশ দাতা। কিছু সম্পত্তি আঞ্জুমান তার নিজস্ব অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করেছে, বাকি কিছু সম্পত্তি সরকার কর্তৃক মঞ্জুরীকৃত।

দুঃস্থদের সেবায় প্রশংসনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আঞ্জুমান বেশ কিছু পুরস্কার লাভ করেছে। যেমন ১৯৯৪ সালে ইসলামী ফাউন্ডেশন পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, ২০০৪ সালে ডা. ইব্রাহীম মেমোরিয়াল পুরস্কার, ২০০৪ সালে রফিকুল ইসলাম ব্যাংকিং পুরস্কার এবং ২০০৫ সালে নগর পদক লাভ করে। আঞ্জুমানের মানবকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস-এর কনরাড হিলটন ফাউন্ডেশন ১৯৯৯ সালে ‘হিলটন ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ প্রদান করে।  [কাজী আবুল কাশেম]