আঞ্জুমান


আঞ্জুমান ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে উনিশ শতকে মুসলমানদের মধ্যে সভাসমিতি গঠন করার প্রবণতা দেখা দেয়। অবিভক্ত বাংলায় বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত ‘আঞ্জুমান’ ছিল এ জাতীয় সংগঠন। বাংলার মুসলিম সমাজের অগ্রসর অংশ এগুলি গঠন করে ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি বিষয়ক নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের উন্নতির চেষ্টা করে। উনিশ শতকের প্রথমদিকে রামমোহন রায় কলকাতায় প্রথম আত্মীয় সভা (১৮১৫) নামে একটি ধর্মীয়-সামাজিক সভা গঠন করেন। এরপর কলকাতাতে স্থাপিত হয় গৌড়ীয় সমাজ (১৮২৩), অ্যাকাডেমিক সভা (১৮২৮), ব্রাহ্ম সমাজ (১৮২৯), ল্যান্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (১৮৩১),  তত্ত্ববোধিনী সভা (১৮৪২) ইত্যাদি। ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিমূলক এসব সংগঠন কলকাতার হিন্দু সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, জমিদার ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা পরিচালনা করতেন। এগুলিতে মুসলমানের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে।

১৮৫৫ সালের ৮ মে কলকাতায় প্রথম মুসলিম সংগঠন আঞ্জুমানে ইসলামী স্থাপিত হয়। কলকাতা আদালতের কাজী-উল-কুজ্জত ফজলুর রহমান এর সভাপতি এবং মুহম্মদ মজহার সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া কার্যনির্বাহী কমিটিতে ছিলেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবদুল লতিফ, দূরবীণ-এর সম্পাদক আবদুর রউফ ও অন্যান্য শিক্ষিত ব্যক্তি। ১৮৫৬ সালের নিউ ক্যালকাটা ডাইরেক্টরি (পার্ট-৬) থেকে জানা যায়, আঞ্জুমানের কার্যনির্বাহি কমিটিতে ১ জন সভাপতি, ২ জন সহ-সভাপতি, ১ জন সম্পাদক ও ১৪ জন সদস্য ছিলেন। তাঁরা অধিকাংশই মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রাপ্ত। আঞ্জুমানে ইসলামি-র গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমানের মধ্যে ঐক্য বিধান ও তাদের কল্যাণ সাধন করা,  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মুসলমান প্রজার মধ্যে সংহতি গড়ে তোলা, ইসলাম ধর্মের উৎকর্ষ সাধন ও প্রচারে সচেষ্ট হওয়া ইত্যাদি। গঠনতন্ত্রে আরও বলা হয় যে, ভারতবর্ষের মুসলমানরা সরকারের কাছে বিধিসম্মত উপায়ে আবেদন করবে এবং বিদ্রোহমূলক এমন কিছু করবে না যাতে সরকারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে আঞ্জুমানে ইসলামী ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব সমর্থন তো করেই নি, বরং সভার আয়োজন করে এর বিরোধিতা করে। সমকালের অপর সংগঠন  ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনও (১৮৫১) সিপাহি বিপ্লবের বিরোধিতা করে। বিদ্রোহ শেষ হলে আঞ্জুমানের পক্ষ থেকে ১৮৫৮ সালের ১৪ নভেম্বর মহারানী ভিক্টোরিয়াকে একটি অভিনন্দনবাণী প্রেরণ করা হয়।

আঞ্জুমানের মাসিক সভা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল। সভায় উর্দুফারসি ভাষায় প্রবন্ধাদি পাঠ ও আলোচনা হতো। সভার কার্যবিবরণী  লেখা হতো ফারসিতে। খ্রিস্টান মিশনারিরা ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করত, সেসবের পাল্টা জবাবে প্রবন্ধ লিখে আঞ্জুমানের সভায় পাঠ করা হতো এবং পরে দূরবীণ পত্রিকায় ছাপানো হতো।

আঞ্জুমানে ইসলামী দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। ১৮৬৩ সালে আবদুল লতিফ কর্তৃক মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি গঠিত হওয়ার আগেই আঞ্জুমানের কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়ে। সম্ভবত নেতৃত্বের দুর্বলতা এর প্রধান কারণ ছিল। আবদুল লতিফ আঞ্জুমানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। সংগঠন হিসেবে আঞ্জুমানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো: কলকাতার শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রথম স্বসমাজের স্বার্থে একত্রে মিলিত হয়ে সোচ্চার হতে পেরেছিল।

কলকাতার আঞ্জুমানে ইসলামী লোপ পেলেও বাংলার মফস্বল শহরগুলিতে বিভিন্ন সময়ে আঞ্জুমানে ইসলাম, আঞ্জুমানে ইসলামিয়া নামে বহুসংখ্যক সমিতি স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠার কাল অনুসারে স্থান-ভিত্তিতে সাজিয়ে সমিতিগুলিকে এভাবে উল্লেখ করা যায়: ময়মনসিংহ (১৮৭৫), চট্টগ্রাম (১৮৮০), নোয়াখালী (১৮৮৫), রংপুর (১৮৮৭), কুমিল্লা (১৮৮৭), ফরিদপুর (১৮৯২), জলপাইগুড়ি (১৮৯২), শ্রীহট্ট (১৮৯৪), দিনাজপুর (১৮৯৪), সিরাজগঞ্জ (১৮৯৮), পাবনা (১৯০৫), দার্জিলিং (১৯০৯) ইত্যাদি। এ ছাড়া ঢাকা, পান্ডুয়া (হুগলি), বীরভূম, নাটোর, বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া প্রভৃতি অঞ্চলে আঞ্জুমানে ইসলামিয়া গড়ে ওঠে। বাংলা সরকার প্রণীত সংশোধিত সমিতি-তালিকা (১৯২৩) থেকে জানা যায় যে, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফরিদপুর, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর এবং পাবনার আঞ্জুমানে ইসলামিয়া সরকারের স্বীকৃতি লাভ করে। তালিকায় ওই সময় আঞ্জুমানগুলির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, কার্যকর পরিষদের কর্মকর্তা, সদস্য-সংখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে  বিবরণ রয়েছে। কোনো কোনো আঞ্জুমান কলকাতার সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৮) এবং উত্তর প্রদেশের ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশনের (১৮৮৮) সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করত। সিরাজগঞ্জের আঞ্জুমান প্রথমটির সঙ্গে এবং ময়মনসিংহ ও রংপুরের আঞ্জুমান দ্বিতীয়টির সঙ্গে জাতীয় বিষয়ে সমর্থন জানিয়ে চিঠিপত্রও আদান-প্রদান করেছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রেরণ করেছিল প্রতিনিধি।

সাধারণভাবে বিচার করে বলা যায় যে, সমকালের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিষয় ছাড়াও ধর্ম ও শিক্ষা বিষয়ে মতামত প্রকাশ ও কর্মসূচি গ্রহণ করা ছিল এসব সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য। সমগ্র দেশের এসব বিষয়ের সঙ্গে স্থানীয় সমস্যাগুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সদস্যদের অনুভূতি ছিল স্পর্শকাতর এবং দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সাম্প্রদায়িক। সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা লাভ, রাজনৈতিক আন্দোলনে সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিরোধ ও মতপার্থক্য ছিল প্রবল। গো-বধের মতো বিষয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল। আঞ্জুমানগুলি এসব বিষয়ে মুসলমান সমাজের স্বার্থকেই বড় করে দেখেছে। আর এভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সমাস্তরাল মুসলিম জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।

স্বসম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার চেতনা থেকে বলা হয় যে, মুসলমান সমাজে যেসব হিন্দুয়ানি আচার-কুসংস্কার প্রবেশ করেছে সেগুলি সংস্কার করা আবশ্যক। দীক্ষিত ধর্মপ্রচারক দ্বারা ইসলাম প্রচারের কর্মসূচি গৃহীত হয়। ধর্মীয় শিক্ষার সমর্থনে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনও গড়ে ওঠে।

এসব সংগঠন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় জমিদার, জোতদার, শিক্ষিত ব্যক্তি, পদস্থ কর্মচারী ও ধর্মীয় নেতা। কোনো কোনো আঞ্জুমানে সাধারণ কৃষকও সদস্যভুক্ত ছিলেন। এক্ষেত্রে আঞ্জুমানগুলির ভূমিকা তৃণমূল পর্যায়ে প্রসারিত ছিল। বলা বাহুল্য, মফস্বলে আঞ্জুমানের সভার কার্যক্রম, নথি, প্রচারপত্র বাংলা ভাষায় সম্পন্ন হতো।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নামভেদে আরও আঞ্জুমান ছিল যেগুলি ঊনিশ শতকের শেষের দিকে গঠিত হয়। আঞ্জুমানে হেমায়েতে এসলাম (রাজশাহী ও বরিশাল), আঞ্জুমানে এত্তেফাকে এসলাম (কুমারখালি), আঞ্জুমানে তাইদে ইসলাম (নদীয়া), আঞ্জুমানে মঈনাল এসলাম (টাঙ্গাইল), আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম (টেঙ্গাপাড়া), আঞ্জুমানে রেয়ায়েতে ইসলাম (কুমিল্লা), আঞ্জুমানে আশ-আতে ইসলাম (নোয়াখালী), আঞ্জুমানে মোখায়েরুল ইসলাম (সিরাজগঞ্জ) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এগুলির সাংগঠনিক রূপ এবং কর্মকান্ড পূর্বের আঞ্জুমানের সঙ্গে অভিন্ন ছিল। পূর্বোক্ত সংশোধিত সমিতি-তালিকায় এর অনেকগুলির নাম-পরিচয় আছে।  বিশেষত মির্জা ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে রাজশাহীর আঞ্জুমানে হেমায়েতে এসলাম (১৮৯১), হেমায়েতউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বরিশালের আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলাম (১৮৯৩), আবদুল আজিজের নেতৃত্বে আঞ্জুমানে আশ-আতে ইসলাম (১৮৯৬) এবং মুহম্মদ নঈমুদ্দীনের নেতৃত্বে  আঞ্জুমান-ই-মঈনাল ইসলামের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা লক্ষ্যযোগ্য ছিল। টেঙ্গাপাড়ার আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম বিখ্যাত লাল ইসতেহার প্রচার করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্বরাজ আন্দোলনের বিরোধিতা করে আঞ্জুমানের সম্পাদক ইবরাহিম খান ইশতেহারটি প্রণয়ন ও প্রচার করেন।

বস্ত্তত, আঞ্জুমানগুলি বাংলার মুসলিম সমাজে একটি জাল বিস্তার করেছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে মুসলমানগণ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে নানা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। সমাজসচেতন এক শ্রেণির মুসলমান এগুলির মাধ্যমে একত্র হন এবং দেশিয় ও স্থানীয় সমস্যার মোকাবেলা করে জনমনে নবজাগরণের সঞ্চার করেন। আঞ্জুমানগুলির প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলিম সমাজে বিদ্যমান ছিল ফরায়েজীওহাবী আন্দোলনের জেহাদি মনোভাব। পাশ্চাত্য আদর্শে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল বহুমুখী। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে নেতৃবৃন্দ প্রধানত সমাজের উন্নতির চেষ্টা করেছেন। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত একশ বছরের ইতিহাস রচনায় আঞ্জুমানের ভূমিকা গুরুত্বসহ বিবেচিত হবে।

আঞ্জুমানগুলির পরিণতি সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায়, বিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশের দশকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগ জনপ্রিয়তা অর্জন ও প্রাধান্য বিস্তার করলে এসব ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন সভা-সমিতি তার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। এন.কে সিনহা আঞ্জুমানগুলিকে মুসলিম লীগের অগ্রবর্তী সংগঠন বলেই উল্লেখ করেছেন। ১৯৪৭-এর বাংলা বিভাগের পর এগুলির অস্তিত্ব ক্রমশ লোপ পায়।  [ওয়াকিল আহমদ]

গ্রন্থপঞ্জি  Revision of the List of Associations recognised by Government (corrected up to 1st April, 1923), Government of Bengal, Political Dept., Calcutta, 1923; Hossainur Rahman, Hindu-Muslim Relation in Bengal (1905-1947), Bombay, 1974; NK Sinha, History of Bengal (1757-1905), Calcutta, 1967.