আগমনী-বিজয়া


আগমনী-বিজয়া  শিব-পার্বতী (উমা/দুর্গা)-র কাহিনী অবলম্বনে রচিত এক প্রকার জনপ্রিয় বাংলা গান। এর সঙ্গে শারদীয় দুর্গাপূজার একটা সম্পর্ক আছে। ধনাঢ্য পিতা গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা পার্বতীর বিবাহ হয় দরিদ্র শিবঠাকুরের সঙ্গে। বিবাহের পর কন্যা স্বামীর ঘরে চলে গেলে সেখানে মেয়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের কথা চিন্তা করে মা মেনকার মাতৃহূদয় আকুল হয়ে ওঠে। শারদীয় কোনো এক রাতে মা-মেয়ে উভয়ে উভয়কে স্বপ্নে দেখেন। মেনকা স্বামীকে অনুরোধ করেন উমাকে নিজগৃহে নিয়ে আসার জন্য। পিতা-মাতার অনুরোধে উমা মাত্র তিনদিনের জন্য পিতৃগৃহে আগমন করেন। তাঁর এ আগমনকে কেন্দ্র করে রচিত গানই আগমনী গান। পিতৃগৃহে তিনদিন অবস্থানের পর উমা যখন পুনরায় পতিগৃহে ফিরে যান, তখন যে বিষাদের সুর বেজে ওঠে তাকে কেন্দ্র করে রচিত গানগুলিই বিজয়া গান নামে পরিচিত। এ দু প্রকার গানকে একত্রে বলা হয় আগমনী-বিজয়া গান। এ গানের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ কবি  রামপ্রসাদ সেন (আনু. ১৭২০-১৭৮১)। পরে আরো যাঁরা এ গান রচনায় খ্যাতি অর্জন করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কমলাকান্ত ভট্টাচার্য (আনু. ১৭৭২-১৮২১), রামবসু (১৭৮৬-১৮২৮) ও  দাশরথি রায় (১৮০৬-১৮৫৭)।

আগমনী-বিজয়া গানের অনুপ্রেরণা এসেছে বৈষ্ণব গীতিকবিতা থেকে। উভয়েরই মূল রস মধুর, তবে আগমনী-বিজয়া গানে করুণ রসেরও অভিব্যক্তি ঘটে। তাছাড়া বৈষ্ণব কবিতায় থাকে ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রাধান্য, আর আগমনী-বিজয়া গানে থাকে সর্বজনীনতার সুর। মঙ্গলকাব্যের রুদ্রচন্ডী এ গানে একাধারে কন্যা ও মাতৃরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। গানগুলিতে বাৎসল্য ও করুণরসের অপূর্ব সমাবেশ দেখা যায়। এ গানের বিষয়বস্ত্ত বাঙালি হিন্দুর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের গার্হস্থ্য জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং বাস্তবতার এক নিখুঁত চিত্র পাওয়া যায় এসব গানে। বাঙালি পরিবারের কন্যা ও জামাতাগৃহের বিরোধের কথাও এতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

আগমনী-বিজয়া গানের মধ্য দিয়ে শাক্তপদাবলির সংসারমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাঙালি হিন্দু মেয়েদের যখন বাল্যবিবাহ হতো তখন মা মেনকার মতো বাঙালি মায়েরাও স্বামীগৃহে মেয়ের সুখ-দুঃখের কথা চিন্তা করে উদ্বিগ্ন হতেন। তাঁরাও আকুলভাবে মেয়েকে কাছে পেতে চাইতেন, আর মেয়েরাও উমার মতো পিতৃগৃহে আসার জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকত এবং সে সুযোগটি ঘটত সাধারণত শারদীয় দুর্গাপূজার সময়। এ সময় মেয়েকে কাছে পেয়ে মা স্বস্তি বোধ করতেন, আনন্দিত হতেন, আবার বিদায়ের সময় মেনকার মতোই দুঃখে কাতর হতেন। সমাজের এ প্রেক্ষাপটে আগমনী-বিজয়া গান বাঙালি জীবনে এক অস্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

কিন্তু বাংলা গানের এ ধারা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, কারণ জগজ্জননীরূপে চন্ডীর যে ব্যাপকতা, তাকে তাঁর কন্যারূপ স্বল্পপরিসরে বেশি দিন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। মাতাকে কন্যারূপে কল্পনা করে ভক্তদের মধ্যে ভক্তিসাধনার পরিবর্তে স্নেহবাৎসল্যের এক প্রবল তরঙ্গ দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সে তরঙ্গ আবার অল্পতেই স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে। তাই এ গানের ধারা আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। তবে বাঙালি হিন্দুরা এখনও শারদীয় দুর্গাপূজার সময় উমা-শিবকে নিজেদের মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে অভেদ জ্ঞান করে আনন্দ-বেদনা অনুভব করে।  [দুলাল ভৌমিক]