আইবিস


কালো দোচোরা (Black Ibis)
কাস্তেচোরা (White Ibis)

আইবিস (Ibis)  Ciconiiformes বর্গের Threskiornithidae গোত্রের পানিতে হাঁটা (wading) বক সদৃশ পাখি। এদের পা ও গলা লম্বা এবং ঠোঁট কাস্তের মতো নিচের দিকে বাঁকানো। জলাভূমির এ পাখি লম্বা পা ফেলে ঘুরে ঘুরে ছোট মাছ ও শামুক খায়। গলা ও পা ছড়িয়ে এবং ডানা ঝাপটে এরা উড়ে বেড়ায়। প্রজননকালে প্রায়শ দলবদ্ধ হয়ে নিচু ঝোপঝাড় বা গাছে ডালপালা দিয়ে বাসা বাঁধে। প্রতি বাসায় ডিমের সংখ্যা ৩-৫। দক্ষিণ আমেরিকা ছাড়া আইবিস সর্বত্র দেখা যায়। এরা স্পুনবিল পাখিদের জ্ঞাতি এবং একই বর্গভুক্ত। সারা বিশ্বে প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ২৫ এবং বাংলাদেশে ৩।

বাংলাদেশের আইবিস পাখি (Aves, Ciconiiformes: Threskiornithidae): দোচোরা, Glossy Ibis (Plegadis falcinellus): প্রজনন মরসুমে পূর্ণবয়স্ক পাখির পিঠ উজ্জ্বল কালো, নিচের দিক বাদামি, ঠোঁট লম্বা বাঁকা, মাথা পালকঢাকা। অন্য সময় পাখির মাথা ও গলা বাদামি, তাতে সাদা ছিটা থাকে। স্ত্রী-পুরুষ দৃশ্যত অভিন্ন। বসবাস যূথবদ্ধ, দেখা যায় বড় বড় বিল, নদীর পাড়, জলাভূমি, ইত্যাদিতে। দল V বিন্যাসে ওড়ে। ঘুমায় গাছে। প্রজনন ঋতুতে ডাকে, অন্য সময় নীরব। মে-জুলাই মাসে মিশ্র নল-খাগড়ার বনে বাসা বাঁধে। ২-৩টি নীল-সবুজ ডিম পাড়ে, তা দেয় দুটি পাখিই। এরা দেশের উপকূল, পদ্মা, হাওর অঞ্চলে বিস্তৃত।

কালো দোচোরা, Black Ibis (Pseudibis papillosa): কালোপাখি, ঘাড়ের কাছে একটি কালো-স্পষ্ট সাদা ফালি, পা লাল। ঠোঁট বাঁকা। মাথা পালকহীন, কালো, চূড়ায় ত্রিকোণাকার কয়েকটি লাল রঙের আঁচিল। স্ত্রী ও পুরুষ দৃশ্যত অভিন্ন। উš§ুক্ত গ্রামাঞ্চলে জোড়ায় বা দলে থাকে। V বিন্যাসে সদলে ওড়ে, কিছুটা ভেসে চলার সময় ডানা ঝাপটায়। উড়ালের সময় উচ্চস্বরে, নাকিসুরে জোরে, কিংবা চখাচখির মতো ২-৩ বার ডাকে। মার্চ-অক্টোবরে বাসা বাঁধে। ডিম ২-৪, হালকা সবুজ, কখনও দাগহীন বা বাদামি ফোঁটা ও দাগ থাকে। এরা উপকূল অঞ্চলে বিস্তৃত।

কাস্তেচোরা, Black-headed Ibis [White Ibis] (Threskiornis melanocephalus) কালো রঙের বড় পাখি, কালো মাথা ও গলা পালকহীন। ঠোঁট কালো, শক্ত, নিচের দিকে বাঁকা। প্রজনন মরসুমে কাঁধে ও গলায় কিছু কালচে ধূসর পালক এবং গলার গোড়ায় কিছু শোভাবর্ধক পালক গজায়। স্ত্রী-পুরুষ দৃশ্যত অভিন্ন। জলাভূমিতে যূথবদ্ধ দেখা যায়। এদের স্বরযন্ত্র না থাকায় নীরব। শুধু বাসা তৈরির সময় অদ্ভুত মায়াস্বরে (যেন অন্যের স্বর) ডাকে। জুলাই-আগস্ট মাসে বাসা বানায়। নীলচে বা সবুজ-সাদা ২-৪টি ডিম পাড়ে। দেশে এদের বিস্তৃতি ব্যাপক।

প্রাচীনকালে মিশরীয়দের দৈনন্দিন জীবনে ‘পবিত্র আইবিস’ (Threskiornis aesthiopicus) ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা কোনো কোনো প্রাণীকে তাদের দেবতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করত। এ পাখি ছিল বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবতা (Thoth)। প্যাপিরাসের তৈরী কাগজে অাঁকা এক ছবিতে আছে পরলোকের অনুষ্ঠানে দেবতা (Thoth) আইবিসের মাথাসহ এক রুগ্ন ব্যক্তির হূৎপিন্ড ওজন করছে। মন্দিরে জীবন্ত আইবিস রাখা হতো এবং মৃত্যুর পর এগুলিকে মমি বানানো হতো। দুর্ভাগ্যবশত, মিশরীয় সংস্কৃতিতে আইবিসের গুরুত্ব সত্ত্বেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি ওই দেশেই পাখিটির বিলুপ্তি ঘটে, যদিও তা অন্য দেশে আজও বেঁচে আছে।  [মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম]