আইন ও সমাজ


আইন ও সমাজ  মূলত সম্পত্তি সম্পর্কিত আইনকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে যে সম্পর্ক বিরাজ করে তা আইন ও সমাজের আন্তঃসম্পর্কের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। অন্যান্য দেশের মতো বাংলায়ও বিচার সংক্রান্ত কর্তৃত্ব সর্বদাই রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি দিক। বিচার প্রাপ্তির লক্ষ্যে কোনো ব্যক্তি একজন বিচারকের বা আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে ঊর্ধ্বতন এক কর্তৃপক্ষের সার্বভৌম ক্ষমতা স্বীকার করে নেয় এবং নিজেকে রাজনৈতিক ও বিচার সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ করে। তথাপি বাংলার শাসকদের হাতে বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতার দাবিকে বৈধ করার মতো পরিপূর্ণ ব্যবহারিক উৎস ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রায় কখনোই কুক্ষিগত ছিল না।  ফলে বাংলা সর্বদাই এমন একটি দেশ ছিল যেখানে একই এলাকা ও জনগোষ্ঠীর ওপর একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বিচার সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।

বিগত দু হাজার বছর ধরে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আইনগত বিভিন্নতা ছিল সেগুলোও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। মধ্যযুগের গোড়ার দিকে বাংলায় বেশ কিছু ব্যবস্থা ছিল যাতে সম্পত্তিবিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সমঝোতা, সালিশি ইত্যাদির ব্যবহার ছিল; অপরাধমূলক আচরণ সংজ্ঞায়িত করা ও শাস্তি বিধানের কাজেও সেসব পদ্ধতির প্রয়োগ ছিল। গুপ্তযুগে (৪র্থ-৬ষ্ঠ শতক) সম্ভবত সবার্ধিক গুরুত্বপূর্ণ বিচার সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ছিল ‘অধিকরণ’, যা গঠিত হতো একজন রাজকর্মচারী ও বিভিন্ন সমবায় সংঘের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে। অধিকরণে বণিক ও সওদাগররা যে ভূমিকা পালন করত তা থেকে গুপ্তরাজ্যের কর্তৃত্ব গঠনে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিবরণ সংবলিত তাম্রলিপি থেকে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়াবলিও অধিকরণে রেকর্ড করা হতো। অধিকরণে বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পেশা ও গোত্রের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ছিল। অধিকরণের কাঠামো ছিল যৌথ বা কর্পোরেট ধরনের। এ থেকে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, অধিকরণের কাজ ছিল বাদী-বিবাদী পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসা সাধন করা, তাদের ওপর কোনো নিষ্পত্তি আরোপ করা নয়।

মধ্যযুগের প্রাথমিক পর্বে গুপ্ত সাম্রাজ্য বহুধাবিভক্ত হলে পল্লী অঞ্চলের বড় ব্যবসায়ীদের অর্থ, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ মহাজনরা তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলে। তারা কখনও ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য শক্তির কর্তৃত্ব গ্রহণ করত, কখনও বা তাকে প্রতিরোধ করত। বাংলার ইতিহাসে কেন্দ্রের শাসক ও আঞ্চলিক শাসকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেসব প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল বিচার সংক্রান্ত  ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিরোধ। গুপ্তযুগ পরবর্তী শাসকরা ভূমি দান, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা দান করে স্বাধীন ভূমি-মহাজনদের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাসকদের সাংস্কৃতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কেন্দ্রের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নিত। মুগল-পূর্ব যুগে এ শাসকরা ছিল প্রায়শই একেক জন সেনাধ্যক্ষ যারা উত্তর ভারত থেকে বাংলায় এসেছিল।

বাংলায় সুলতানি (তেরো-ষোল শতক) এবং মুগল (ষোল-আঠারো শতক) আমলে অনুরূপ প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। তত্ত্বগতভাবে বাংলার সুলতান ও মুগল শাসকদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছিল নিরঙ্কুশ। শাসনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ব্যবহূত হবে প্রজাদের কল্যাণসাধন এবং তাদের মধ্যে সদগুণাবলি লালনের কাজে। সুলতানি আমলে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ফখরুদ্দীন রাজির (মৃ ১২০৯) ভাষায়, ‘জগৎ  একটি বাগান, আর রাষ্ট্র সে বাগানের মালী; আর রাষ্ট্র মানেই সুলতান, যার অভিভাবক হচ্ছে আইন।’ এ ধরনের বক্তব্যে বাংলার স্থানীয় গোষ্ঠীপতিদের সঙ্গে সুলতানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগি করার বা অন্য কোনোরূপ ক্ষমতা-বণ্টনের সুযোগ তেমন নেই। কিন্তু বাস্তবে বাংলার নতুন মুসলিম শাসকদের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কিছু আপস-রফা অপরিহার্য ছিল।

মধ্যযুগের শেষ ও আধুনিক যুগের প্রথম দিক জুড়ে বাংলায় বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতার দুটি প্রধান উৎস পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল, যথা- স্থানীয় (প্রায়শ হিন্দু) এবং প্রাদেশিক রাজধানীস্থ মুসলিম সুলতান বা মুগল শাসক। এ দু শক্তির মধ্যে ক্ষমতার খেলা চলত বিচার সংক্রান্ত কর্তৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আপস-সমঝোতার মধ্যে। স্থানীয় সমাজব্যবস্থার আধিপত্য-পরম্পরার স্থিতিশীলতা রক্ষাকল্পে প্রজাদের মধ্যকার নানা বিরোধের মীমাংসা সাধন করা রাজাদের কর্তব্যের একটা অনিবার্য অংশ ছিল। সুলতান বা মুগল দরবারের বাইরে থেকে অনেক কর্মকর্তা ও ভূমির মালিকদের ইসলামী সমাজের অন্তর্ভুক্ত করা হতো; তাদের অনেকে ছিলেন অমুসলিম। ফলে, চৌদ্দ শতকের শেষ পাদে মওলানা মুজাফ্ফর শামস্ বল্খি প্রমুখের মতো সুফিগণ অভিযোগ করেন যে, সালিশ পরিচালনাসহ মুসলমানদের ওপর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকার দেওয়া হয়েছে ‘অবিশ্বাসীদের’ হাতে। কিন্তু তথাপি স্থানীয় শাসকদের বিভিন্ন রকমের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অস্বীকার করে সুলতানি ও মুগল শাসকদের নিজ নিজ কর্তৃত্ব অর্জন করা সম্ভব ছিল না।

আধুনিক যুগের প্রথমদিকে বাংলায় বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের নানা কাঠামো যুগপৎ চালু ছিল, যাদের এখতিয়ার সুস্পষ্টভাবে আলাদা ছিল না বলে তারা প্রায়শই একে অপরের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করত। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে আইন তৈরি করত ও তার ব্যাখ্যা দিত। বাংলার অস্থির, দ্বন্দ্বপূর্ণ সামাজিক কাঠামোতে বিচারব্যবস্থার বহু বিচিত্র ধারা বিকাশ লাভ করেছিল। তত্ত্বগতভাবে কাজীরা ছিলেন সুলতানি বা মুগল শাসকদের প্রতিনিধি। কিন্তু প্রত্যেক শহরের ইসলামী বিচারকদের এমন একটা কর্তৃত্ব ছিল যা রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন। সুলতান বা দেওয়ানের ছিল প্রকৃত ক্ষমতা, কিন্তু কাজীর অবস্থান নির্ভরশীল এমন একটা কর্তৃত্বের ওপর যার কোনো সীমাবদ্ধ এলাকা ছিল না। কাজীদের এ কর্তৃত্ব নির্ভর করত তাদের ইসলামী আইনের অনুশাসনগুলো ব্যাখ্যা করার সামর্থ্যের ওপর এবং অন্যদিকে স্থানীয় শহুরে চাকুরিজীবী অভিজাত লোকদের মধ্যে তাদের অবস্থান ও মর্যাদার ওপর। ইসলামী আইন সম্পর্কে কাজীর বিশেষ জ্ঞান তার কর্তৃত্বের একটা স্থানীয় বৈধতা দান করত যা ছিল সুলতানি বা মুগল শাসকদের নিয়মকানুন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ফলে, কাজীদের বিচার-সংক্রান্ত কর্তৃত্ব ছিল একটা বিকল্প বিচার ক্ষমতা, যা মুসলমান ও অমুসলমান উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হতো বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসা, জমি ক্রয়-বিক্রয়, নিবন্ধন ও ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি বিধানের কাজে। কাজীরা কখনও কখনও সার্বভৌম শাসকের নানা সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করে দেখতেন।

বারো শতক থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে বাংলায় এক স্বতন্ত্র হিন্দু উত্তরাধিকার আইন বিকাশ লাভ করে জীমূতবাহনের টীকাভাষ্য দায়ভাগকে কেন্দ্র করে। পরবর্তী কয়েক শতকে বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র বা টোলে এ ধারার আরও বিকাশ ঘটে। ঢাকার বিক্রমপুর, চন্দ্রদ্বীপ (বর্তমানে বরিশাল জেলায়) এবং আরও বিখ্যাত নদীয়ার (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে) টোল এক্ষেত্রে ছিল উল্লেখযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্র। হিন্দু বিচারব্যবস্থা স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অধিকতর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। বাংলার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলো স্থানীয় রাজপুত্রদের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। মুসলমান কাজীরা নিজেদের মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্য বিবেচনা করতেন, ফলে তাদের আইন সংক্রান্ত চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনার লক্ষ্য ছিল সর্বজনীন আইনগত মূল্যবোধ অন্বেষণ। অন্যদিকে হিন্দু আইনজীবীদের প্রয়াস ছিল একটি আদর্শভিত্তিক ধর্মীয় সামাজিক ব্যবস্থা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে বাস্তব ও ব্যবহারিক সামাজিক রীতিনীতির ভারসাম্য সাধন করা। আধুনিক হিন্দু বিচারব্যবস্থার গোড়ার দিকে ‘প্রথা’র একটা স্থান ছিল, যা ইসলামী আইনে দেখা যায় না।

আধুনিক যুগের প্রাথমিক পর্বে বাংলার বহুকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থায় শাসকরা প্রায়শ বাদী-বিবাদীর ওপর কোনো নিষ্পত্তি চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের মধ্যে আপস-মীমাংসাকে উৎসাহিত করতেন। অনিচ্ছুক পক্ষের ওপর সার্বভৌম শাসক নিজের ইচ্ছাপ্রসূত সিদ্ধান্ত আরোপের পরিবর্তে একটি দলিল রচনায় উৎসাহ দিতেন, যে দলিলে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে একটি মীমাংসা চুক্তির বিবরণ থাকবে, যেটিকে রাজীনামা বলা হতো। দু পক্ষের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে একজন অধিকতর মানী ব্যক্তিকে নিয়োগ করার পর চুক্তির শর্তগুলো গ্রহণে উভয় পক্ষের সম্মতির প্রয়োজন হতো। অনুরূপ পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধেরও মীমাংসা করত বণিক সমিতিগুলো, যারা স্থানীয় ও আঞ্চলিক রাজশক্তির প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে মধ্যস্থতা করার রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করত। মীমাংসা চুক্তি লঙ্ঘিত হলে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ পক্ষ প্রতিকার চেয়ে শাসক বা বণিক সমিতির কাছে আপিল জানাতে পারত। তবে সে ধরনের সমঝোতাও মধ্যস্থতা বা সালিশ প্রক্রিয়ার প্রকাশ্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল।

আধুনিক যুগের শুরুর দিকে বাংলার সালিশি ব্যবস্থায় চুক্তি ভঙ্গকারীর যেমন সার্বভৌম শাসকের বিরাগভাজন হওয়ার কারণ থাকত, তেমনি মনে করা হতো যে, যে ব্যক্তি সালিশের মাধ্যমে গৃহীত নিষ্পত্তি চুক্তি ভঙ্গ করবে স্থানীয় সমাজের কাছে তার সম্মান ও মর্যাদাহানি ঘটবে। চুক্তি ভঙ্গের পর বিরোধ দ্রুত প্রবল হয়ে উঠত এবং কখনও কখনও সহিংস পরিণতি ঘটত। বিরোধের ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অতি উচ্চমূল্য দিতে হতো বলে যেকোন বিরোধ মীমাংসায় সালিশি ব্যবস্থা ও পারস্পরিক সম্মতির ওই সংস্কৃতি বাংলায় গড়ে উঠেছিল।

আঠারো শতকের মাঝামাঝি মুগল নিজামতের কাছ থেকে ক্ষমতা স্থানান্তরিত হয়  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। এ শতকের শেষ তিন দশক জুড়ে কোম্পানি বাংলায় সম্পূর্ণ ভিন্নতর প্রকৃতির বিচার ব্যবস্থা আরোপের উদ্যোগ নেয়। মুগলদের মতো ব্রিটিশদেরও নিজ কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে একটি নিরঙ্কুশবাদী আদর্শিক ধারণা ছিল। ব্রিটিশরা মনে করত যে, ন্যায়বিচার সাধনের যোগ্যতা একমাত্র তাদেরই আছে। কিন্তু মুগলদের মতো কোম্পানির কর্মচারীরা প্রতিদ্বন্দ্বী ভূস্বামী ও স্থানীয় ছোট ছোট রাজাদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা-সমঝোতায় গিয়ে তাদের কোনো প্রভাব অর্থাৎ কোম্পানির নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় অন্যদের ক্ষমতার মিশ্রণ ঘটাবার নীতিতে আদৌ সম্মত ছিল না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মুগল ও নিজামত শাসকরা জমিদারদের সরকারকে প্রদেয় খাজনার হার সম্পর্কে আলোচনার অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু ১৭৯৩ সালে কোম্পানি জমির খাজনা স্থায়িভাবে নির্ধারণের মধ্য দিয়ে ওই আলোচনা বা দরকষাকষির সুযোগ বাতিল করে দেয়। ব্রিটিশরা স্থানীয় ভূস্বামীদের বিচার, সালিশ করার বিশেষাধিকারগুলোও কেড়ে নেয়। এর পরিবর্তে কোম্পানি নিজস্ব কতগুলো বিচার প্রতিষ্ঠান গঠন করে যার উদ্দেশ্য ছিল সম্পত্তি সংক্রান্ত এবং ব্যক্তিগত সকল প্রকার বিরোধের বিচার করা। ব্রিটিশদের এ ধরনের নানা উদ্যোগের ফলে বাংলার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদির জটিল সমাহারটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসন পত্তনের পূর্বে ভূস্বামীদের নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল। অবশ্য ব্রিটিশরা মনে করত যে বাংলার রাজনৈতিক নৃপতিরা ছিল নেহায়েত ভূমির মালিক।

বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের ওই নিরঙ্কুশবাদ, যেটিকে জনৈক তাত্ত্বিক ‘আইনের স্বৈরতন্ত্র’ বলে বর্ণনা করেছেন, তা ছিল দুটি বিষয়ের ফল। প্রথমত, আঠারো শতকের শেষদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের একটি ধারণা গড়ে ওঠে। অধ্যাপক পি.জে মার্শাল যেমনটি মনে করেন, ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য জুড়ে জনগণের সম্পত্তির অধিকারকে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন এবং বিশ্বজুড়ে সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়ত, আঠারো শতকের ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশকে একটি প্রাচ্যদেশী স্বৈরতন্ত্র হিসেবে ছাঁচে ঢালতে চেয়েছে, যেখানে সকল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কুক্ষিগত থাকে একজন শাসকের হাতে। ১৮ শতকের শেষদিকে কোম্পানির কর্মকর্তারা উপলব্ধি করে যে, মুগল সাম্রাজ্যের সে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ কর্তৃত্ব তারা অর্জন করেছে। এ দু’ধরনের ভাবনা মিলেমিশে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একক, অবিভক্ত, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের ধারণা জন্ম নেয়।

আঠারো শতকের শেষ পাদে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বাংলার ভূস্বামীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্পত্তি অধিকার সুরক্ষায় আগ্রহী হয়। কিন্তু ব্রিটিশ আইনসভা বা কোম্পানি কাউন্সিলের আইন দ্বারা স্থানীয় রাজনৈতিক নৃপতিদের নেহায়েত জমির মালিকে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছিল না। স্থানীয়দের সম্পত্তির বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ব্রিটিশ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় রাজনৈতিক বিবাদে পক্ষপাতিত্ব করতে বাধ্য হন। বাংলার বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতা ভাগাভাগির অব্যাহত প্রক্রিয়ায় কোম্পানির কর্মচারীরা জড়িয়ে পড়েন। ফলে ব্রিটিশ বিচারালয়গুলোকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানাদির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কাজে লাগায়। শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন শাখা বংশপরম্পরায় ভূসম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জনের লক্ষ্যে সেগুলোকে ব্যবহার করে। জমিদার ও অধস্তন ইজারাদারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও আদালতগুলো ব্যবহূত হতো। ১৭৯০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময়কালে  তালুকদার, হাওলাদার ও অন্যান্য ইজারাদাররা তাদের উর্ধ্বতন ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে তাদের অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ বিচারকদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য লাভ করে। এটা প্রায়শই স্থানীয় কর সংগ্রাহকের প্রতিকূলে যেত, যার একমাত্র বিবেচনা ছিল কথিত ‘ভূমির মালিকে’র মাধ্যমে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করা। এসব ঘটনার ফলে দেওয়ানি মামলার সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ১৮০১ সাল নাগাদ রংপুর জেলায় জজ, রেজিস্ট্রার বা দেশিয় জুডিশিয়াল কমিশনার সমীপে দায়েরকৃত দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এক দশক পরে, ১৮১২ সালের জানুয়ারি মাসে সারা বাংলায় মূল মামলা ও আপিল মামলা মিলে মোট অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৩৯,২৭১।

উনিশ শতকের প্রথম দশক জুড়ে কোম্পানির নিরঙ্কুশ ও কেন্দ্রমুখী বিচার-ক্ষমতার ধারণা এবং তারা নিষ্পত্তি করতে বাধ্য ছিল এমন অসংখ্য স্থানীয় মামলা-বিবাদের মধ্যে একটা সুস্পষ্ট দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সুরাহা হয়েছিল দুটি পন্থায়। প্রথমত, ব্রিটিশরা তাদের কর্তৃত্বের অংশবিশেষ স্থানীয় ভূস্বামীদের হাতে ছেড়ে দেয়। কুখ্যাত পঞ্জম ও  হফতম প্রবিধান (১৭৯৯ সালের ৭ নং প্রবিধান ও ১৮০৭ সালের ৫ নং প্রবিধান)-এর মাধ্যমে ভূস্বামীদের প্রায় খেয়ালখুশিমতো রায়তদের ফসলাদি ক্রোক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলে জমিদাররা তাদের অধীনস্থ ইজারাদারদের সঙ্গে সংগ্রামে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হাতে পেয়ে যায়, যার দ্বারা তারা জমির খাজনা বৃদ্ধি করতে এবং এলাকায় নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে সক্ষম হয়। স্থানীয় সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার অধিকতর ক্ষমতাও ভূস্বামীদের দেওয়া হয়। এ ধরনের আইনের ফলে কিছু কিছু স্বায়ত্তশাসিত ক্ষেত্র তৈরি হয় যেখানে ব্রিটিশদের ‘আইনের শাসন’ হস্তক্ষেপ করতে পারত না।

দ্বিতীয়ত, বাংলায় দেওয়ানি মামলার বিচারের নিয়ম-কানুনগুলো ব্রিটিশরা কেন্দ্রীকরণ করার উদ্যোগ নেয়। উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মামলা মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে এমন কিছুর অন্বেষণ করত যেটাকে তারা ‘দেশিয় প্রথা’ বলে মনে করত। ব্রিটিশদের বিচারালয়গুলো সচরাচর মুসলিম ধর্মগ্রন্থের অনুশাসন বা হিন্দু আইনশাস্ত্র ব্যবহার করত না, কারণ স্থানীয় বিচারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ধর্মগ্রন্থের নির্দেশনার ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য। কোম্পানির বিধানগুলোর দ্বারা বিবাদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নেহায়েত একটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ‘দেশিয় প্রথা’ সংজ্ঞায়িত করার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না বলে ‘প্রথা’ সর্বদাই ছিল একটা পরিবর্তনযোগ্য ধারণা। ‘দেশিয় প্রথা’ আবিষ্কারের জন্য বিশদ ও ব্যয়বহুল স্থানীয় অনুসন্ধানের প্রয়োজন ছিল এবং তা বিভিন্ন জনের দ্বারা বহু বিচিত্রভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ ছিল।

উনিশ শতকের প্রথম তিন দশকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রথা ব্যবহারের পরিবর্তে কেন্দ্রীভূত, লিখিত আইনকানুন প্রতিষ্ঠা শুরু করে। এর একটা দিক ছিল বাংলায় আইনের সংকলন ও ভাষ্য রচনা করা। অবশ্য তার পূর্বে আঠারো শতকের নববইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে আইনের সার-সংকলন গ্রন্থ রচনা শুরু হয়, যেখানে বিভিন্ন মামলার সারসংক্ষেপ ও আইন ভাষ্যকারদের মতামতের সারসংক্ষেপ সংকলিত হতো। স্যার উইলিয়ম জোন্স ও এইচ.টি কোলব্রুক কর্তৃক ১৭৯৪ সালে প্রণীত Digest of Hindu Law প্রকাশিত হয় ১৭৯৫ সালে, কিন্তু আদালতে তার ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। তবে ১৮০৫ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে প্রণীত এ ধরনের গ্রন্থাবলি, যেমন মুসলিম ফৌজদারি আইনের রূপরেখা সংবলিত জে.এইচ হ্যারিংটনের Elementary Analysis of Laws and Regulations এবং হিন্দু ও মুসলিম আইন বিষয়ক ডব্লিউ.এইচ ম্যাকনাটেন-এর Priciples and Precedents বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হতো। পূর্বে বাংলায় বিচার সংক্রান্ত কাজে স্থানীয় প্রথা, ন্যায়পরায়ণতা, বিধি ইত্যাদির যে জটিল নিয়ম ছিল তার পরিবর্তে উনিশ শতকের ত্রিশের দশকের পর থেকে ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিক অর্থে একটি একক আইনমালা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায়। ১৮৩৭ সালে ল’ কমিশন সরকারের কাছে একটি খসড়া দন্ডবিধি উপস্থাপন করে। ইংরেজ আইনের ওপর ভিত্তি করে অভিন্ন ও সংকলিত আকারে দেওয়ানি আইনসমূহের রূপরেখা প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৮৬১ ও ১৮৭৯ সালে দুটি আইন কমিশন নিয়োগ করা হয়। সাক্ষ্য আইন, দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি আইন, চুক্তি ইত্যাদি বিষয় সংবলিত বিধিগুলো অনুমোদিত হয় ১৮৫৩ ও ১৮৮২ সালে। এসব ঘটনা ছাড়াও বিচার প্রশাসন ব্যবস্থাও আগের তুলনায় অনেক বেশি  কেন্দ্রীভূত রূপ লাভ করে ১৮৬২ সালে কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

আইনের ভাষ্য রচনা ও সংকলন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার সংক্রান্ত ব্যাখ্যার অধিকার কেন্দ্রীভূত হতে থাকে ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও কলকাতায় তাদের অনুগত ভারতীয় অভিজাতদের হাতে। কেন্দ্রীকরণের এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় আইন পেশার উদ্ভব ঘটে। পূর্বে উকিলরা জমিদারদের স্থায়ী চাকুরে হিসেবে নিযুক্ত থাকত এবং তারা তাদের জমিদারদের রাজনৈতিক ও বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতার পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করত। তাদের প্রাথমিক আনুগত্য ছিল শুধু জমিদারদের প্রতি। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় আইনজীবী ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা মোকদ্দমা পরিচালনা শুরু করেন, যাদের প্রাথমিক আনুগত্য কোনো ব্যক্তির প্রতি ছিল না, বরং তা ছিল আইন পেশা ও একটি নির্দিষ্ট আদালতের প্রতি। ঔপনিবেশিক আইন পেশায় দেশিয় আইনজীবীদের একটি অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠার পেছনে শিক্ষা ছিল একটি প্রধান উপাদান। কোম্পানির দাবি ছিল যে, আইন পেশার লোকজনকে ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হতে হবে এবং কোনো আদালতে চাকুরি পেতে হলে কোনো সরকারি কলেজের শিক্ষাগত সনদপত্র দাখিল করতে হবে।

বাংলায় আইনের মূল বিষয়ে এ রূপান্তরের বিরোধিতা করেন কতিপয় ব্রিটিশ ও ভারতীয় ব্যক্তি।  রাজা রামমোহন রায় ১৮২২ সালে অভিযোগ করেন যে, ন্যায়বিচারের যে সনদ দ্বারা জনগণের প্রচলিত আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নারীদের উত্তরাধিকারের ব্যাপারে এ দেশের অধিবাসীরা নিশ্চয়তা বোধ করত, উত্তরাধিকার আইন, বিশেষত নারীদের উত্তরাধিকার বিষয়ে আইন প্রণয়নের নতুন উদ্যোগ ন্যায়বিচারের সে সনদের লঙ্ঘন। তার দু বছর পর কোর্টনি স্মিথ নামক একজন ব্রিটিশ বিচারক কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্তদের ‘স্থূল পন্ডিত ও জঘন্য ভল্লুক-ছানা’ বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, ভারতীয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের স্থানীয় ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা প্রয়োজন, বই-পুস্তকের বিমূর্ত তাত্ত্বিক মতবাদ সম্পর্কে নয়। কিন্তু বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব সংহতকরণে বিচার প্রশাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। উল্লিখিত ধরনের সব অভিযোগ অগ্রাহ্য থেকে গেছে।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় আইন ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্কের রূপান্তর ঘটে। বিচার বিভাগীয় নীতিমালা প্রণয়ন প্রক্রিয়া ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও ভারতীয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পেশাজীবী শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে বাংলায় আইনের অনুশীলন ও সামাজিক শক্তির মধ্যে বিরাট দূরত্ব সূচিত হয়; সে দূরত্ব বর্তমান বাংলাদেশেও বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে বাংলার সমাজে নানা ধরনের বিচারব্যবস্থা ক্রিয়াশীল ছিল, তাদের মধ্যে কর্তৃত্বের সংগ্রাম ছিল, কিন্তু প্রত্যেকটি ব্যবস্থাই স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতি মনোযোগী ছিল। ১৭৬৫ সালের পরে এক শতক জুড়ে বাংলায় এমন একটি কেন্দ্রীভূত বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে যা তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভাবমূর্তির উপযুক্ত প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম ছিল। তার ফলে আইন সম্পর্কে এমন ধারণার সৃষ্টি হয় যে, এটি বাংলার পল্লী অঞ্চলের অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের বাইরের একটা বিষয়। তারা কেবল তখনই শেষ পদক্ষেপ হিসেবে আদালতে যেত, যখন বিবাদ নিরসনের ক্ষেত্রে বিকল্প অনানুষ্ঠানিক স্থানীয় পন্থাগুলো, যথা সালিশি মীমাংসা ইত্যাদি ব্যর্থ হতো।

একদিকে বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ, অন্যদিকে জমিদারসহ অন্যান্য অভিজাত সামাজিক শ্রেণির প্রতি আংশিক ছাড়, এ দুয়ের সমন্বয়ের প্রভাব ছিল বাংলার সমাজে ‘ঐতিহ্যবাহী’ উপাদানগুলির সংহতকরণে। কৃষিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ ছাড়াই নিজেদের সম্পদ ব্যবহারে সক্ষম এক শ্রেণির ভূমির মালিকের উদ্ভবের পেছনে বাংলার আইনব্যবস্থার ভূমিকা ছিল অন্যতম। ১৮৬০ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে সেসব জমিদারের ভূমিকা ক্ষীণ হতে শুরু করে। কিন্তু বাংলার অনেক অঞ্চলে তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় তাদেরই মতো রক্ষণশীল শ্রেণির সুবিধাভোগী রায়তরা, যারা জোতদার হিসেবে সমধিক পরিচিত।

নারী ও আইনব্যবস্থার মধ্যকার সম্পর্কের ওপরও এসব প্রক্রিয়ার অনুরূপ প্রভাব পড়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আইনব্যবস্থার অসমসত্ত্বার ফলে ১৮০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত অভিজাত নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি অর্জন ও তার মালিকানা বজায় রাখার বেশ কার্যকর কতগুলো কৌশল আয়ত্ত করেছিল। ব্রিটিশ ও তাদের মিত্ররা ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ও মুসলিম আইনের অভিন্ন সংজ্ঞামূলক বিবরণ রচনা শুরু করলে তাদের সেসব কৌশলের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। উনিশ শতকে নারী জমিদারের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ফলেও অংশত এমনটি ঘটে।

বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব আইন প্রতিষ্ঠান চালু আছে সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ১৮৬১ সালের হাইকোর্ট অ্যাক্ট ও আইন সংকলনের যুগে। গত ১৪০ বছরে বাংলার আইনশাস্ত্রে নিশ্চয়ই কিছু গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটেছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও অর্থনৈতিক মন্দার ফলে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বিশ শতকের গোড়ার দিকে আইন সংস্কার ঘটে নি। পাকিস্তান আমলে আইনের ক্ষেত্রে কয়েকটি মাইলফলক স্থাপিত হয়। তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, যা দ্বারা ঐতিহ্যবাহী মুসলিম বিবাহ আইন সংশোধিত হয়; এবং জমিদারি প্রথার বিলোপ, যাতে অবশ্য জোতদার ও ধনী রায়তদের ক্রমশ বড় ভূস্বামীদের স্থলাভিষিক্ত করার কথা বলা হয়। ১৯৭১ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক আইন প্রণয়ন ও আইনের পুনর্ব্যাখ্যার ঘটনা ঘটে।  এক্ষেত্রে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ১৯৮০ সালের যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন, বহুবিবাহ বেআইনি ঘোষণা এবং ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইন।

আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিচারকের তৈরী আইন এবং গ্রামাঞ্চলে ও অন্যত্র প্রচলিত স্থানীয় আইনগত অনুশীলনের মধ্যকার অবিরাম অসামঞ্জস্য। ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানাদির মতোই বাংলাদেশেও রাষ্ট্র তার কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ভাবমূর্তির উপযুক্ত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, আদালতের আইন অনুসারে নারীদের যে পরিমাণ সম্পত্তির মালিকানা ও দখল ভোগের অধিকার আছে বাস্তবে তারা তার চেয়ে অনেক কম পায়। মাহবুবুর রহমান ও উইলেম ভ্যান শ্যান্ডেল বিশ শতকের আশির দশকে বাংলাদেশের কয়েকটি গ্রামে গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান, নারীরা বাস্তবে জমির মালিকানা ও দখল লাভে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হয়, তারা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য ভরণপোষণের অধিকার ভোগ করে। এ ধরনের স্থানীয় আইন ব্যবহূত হয় গ্রামাঞ্চলের অনানুষ্ঠানিক মাতবরশ্রেণীর দ্বারা। তথাপি, বাংলাদেশের দেওয়ানি আদালতে ব্যবহূত উত্তরাধিকার আইন অনুসারে কন্যা ও অন্যান্য নারীদের ভূসম্পত্তির একটি অংশ লাভের অধিকার রয়েছে। মাহবুবুর রহমান ও ভ্যান শ্যান্ডেলের ভাষায় বলা যায়, আইনবিদদের আইন ও প্রচলিত আইনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বাস্তবে স্থানীয় আইনগত রীতিনীতির ওপর বিচারব্যবস্থার নিজস্ব কর্তৃত্ব আরোপ করা সম্ভব হয় নি।

বিগত দু শতক ধরে বিভিন্ন পদ্ধতির রাষ্ট্র তাদের বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার এবং বিচার ব্যবস্থার অন্যান্য ধরনগুলোকে অস্বীকার করার প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু তারা তা করতে মূলত ব্যর্থ হয়েছে এবং তার ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত আইন ও স্থানীয় সামাজিক শক্তির হাতে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিধিবিধানের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।  [জন ই. উইলসন]