অ্যাক্ট ১০, ১৮৫৯


অ্যাক্ট ১০, ১৮৫৯  ১৮৫৯ সালের ১০ নম্বর আইনে ভূমিস্বত্বভোগী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব ও অধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়।  চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত  জমিদার ও অন্যান্য স্বত্বাধিকারীদের অধিকারের বিষয়ে স্পষ্ট বিবরণ দিলেও  রায়ত বা প্রজাদের অধিকারের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেয় নি। ১৭৯৩ সালের ১ নম্বর প্রবিধান প্রজাদের প্রচলিত অধিকার অস্পষ্টভাবে স্বীকার করলেও এতে এ অধিকারের কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয় নি। ফলে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিরোধের সৃষ্টি হলে জমিদার ভূমির ওপর পূর্ণমালিকানা এবং প্রজাগণ তাদের প্রচলিত অধিকার দাবি করত। আদালতও জমিদার শ্রেণির নিচে অন্যান্যদের অধিকার সম্বন্ধে নিশ্চিত না থাকার কারণে পরস্পরবিরোধী রায় প্রদান করত যা জমিদার ও প্রজার পারস্পরিক সম্পর্কের উপর সুদূরপ্রসারী পরিণতি বয়ে আনত।

বিরোধের সবচেয়ে সাধারণ কারণ ছিল খাজনা বৃদ্ধির জন্য জমিদারদের প্রচেষ্টা। অনেক প্রজাই খাজনা বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করত যার ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটত। ১৮৪০ ও ৫০ এর দশকে বহু নীলকর  নীল চাষের জন্য বেনামিতে প্রজাস্বত্ব ক্রয় করত এবং প্রজাদের অধিকার নির্দিষ্টকরণের জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করত। এভাবে ১৮৫৯ সালে আইন পরিষদে একটি বিল উত্থাপিত হয় যা ওই বছরের দশ নম্বর আইন হিসেবে পাস হয়। প্রজাদের অধিকার ও কর্তব্যের সংজ্ঞা নির্ধারণে এ আইন তাদের তিনটি সাধারণ শ্রেণিতে বিভক্ত করে: ১. একটি নির্দিষ্ট হারে খাজনা প্রদানকারী প্রজা; ২. ভোগদখলের অধিকার আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট হারে খাজনা পরিশোধ করে না এমন প্রজা এবং ৩. স্থায়ী দখলি স্বত্ব নেই, প্রতিযোগিতামূলক হারে খাজনা প্রদান করে এমন প্রজা।

প্রথম শ্রেণিভুক্ত প্রজাগণ ছিল কার্যত কৃষক স্বত্বাধিকারী। কোনো আইন দ্বারা নয়, প্রচলিত প্রথামতে তাদের অধিকার স্বীকৃতি পেত। কোনো অজুহাতেই ঊর্ধ্বতন মালিক পক্ষ তাদের খাজনা বৃদ্ধি করতে পারত না। সামাজিকভাবে তারা মিরাসি বা স্থায়ী প্রজারূপে পরিচিত ছিল। যে সকল খুদকাস্ত বা প্রজা একনাগাড়ে বারো বছরের বেশি সময় জমি ভোগদখল করেছে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ ভোগদখলের অধিকার-প্রাপ্ত প্রজা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো। তাদের খাজনা বৃদ্ধি করা যেত, তবে  পরগনার প্রচলিত হারকে অগ্রাহ্য করা যেত না। তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ দখলিস্বত্ব বিহীন প্রজাগণ পইকাস্ত প্রজা নামে পরিচিত ছিল। তাদেরকে ভূমির ওপর অনিশ্চিত অধিকারসম্পন্ন প্রজা হিসেবে ঘোষণা করা হতো এবং তাদের ঊর্ধ্বতন মালিক পক্ষ প্রতিযোগিতামূলক বাজারের নিরিখে ইচ্ছামতো খাজনা বৃদ্ধি করতে পারত। এ আইন প্রজাদের, বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত প্রজাদের খুশি করতে পারে নি, আর এ তৃতীয় শ্রেণিভুক্তরাই ছিল পল্লী এলাকায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবু এ আইন ভূমি- বিষয়ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সংস্কারের পথ সুগম করে যা ১৮৮৫ সালের  বঙ্গীয় প্রজাস্বত্বব আইন-এর মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।  [নুরুল হোসেন চৌধুরী]