অর্থসংস্থান


অর্থসংস্থান যে কোনো উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ ও পুঞ্জীভবন এবং ব্যয় বহনের জন্য (মূলত ঋণদাতা থেকে) নির্ধারিত শর্তে অর্থগ্রহণ ও পরবর্তী সময়ে (ঋণগ্রহীতা কর্তৃক) তা পরিশোধের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে অর্থসংস্থান বলে। অর্থ মূলধন বা সম্পদ আকারেও হস্তান্তরিত হতে পারে এবং হস্তান্তরের ধরন হতে পারে শেয়ার মূলধন ক্রয়, লভ্যাংশ পরিশোধ বা স্টক/শেয়ার পুনঃবিক্রয়। বস্ত্তত অর্থসংস্থান অর্থশাস্ত্রের একটি শাখা এবং অর্থসংস্থানের কার্যক্ষেত্র হচ্ছে যেমন স্থির মূলধনের বাজার, তেমনি কার্যকরী বা চলতি মূলধনের বাজার; মূলধন জাতীয় সম্পদের যোগান ও দর নির্ধারণ এবং দক্ষ বাজার, ঝুঁকি ও বিনিয়োগ থেকে আয়, সম্পদ প্রতিস্থাপন এবং ‘অপশন’ প্রাইসিং (পছন্দভিত্তিক দর নির্ধারণ) বা কর্পোরেট অর্থসংস্থান ইত্যাদির মাধ্যমে বিভিন্ন বাজার বা সময়ে সম্পদ লেনদেন। বাংলাদেশে অর্থসংস্থানকে মোটামুটি চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়- কৃষি অর্থসংস্থান, শিল্প অর্থসংস্থান, বাণিজ্য অর্থসংস্থান এবং গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান।

কৃষিখাতে অর্থসংস্থান  কৃষকসহ অন্যান্য ব্যক্তি বা সংস্থা যারা কৃষি উৎপাদন, পণ্যের গুদাম ও প্রক্রিয়াজাত এবং বিতরণের কাজে সহায়তার জন্য বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন যথা অনুদান ও ঋণ প্রদান করা হয়। এ খাতে তহবিলের প্রয়োজন মূলত: কৃষি উপকরণ ও ক্রয় উৎপাদন উত্তর কার্যাবলীর জন্য। তহবিল দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং ফসল ঘরে তোলার পরবর্তী সময় পর্যন্ত বা উৎপাদিত পণ্যের বিপণনের প্রয়োজন। জমি প্রস্ত্তত করা, বিভিন্ন উপকরণ ক্রয়, শ্রমের মূল্য অন্যান্য আবর্তন ব্যয় মেটানোর জন্য স্বল্পমেয়াদী তহবিলের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদী তহবিলের প্রয়োজন হয় মূলধনী বিনিয়োগ যথা কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন, ভূমি উন্নয়ন এবং মৎস্য ও পশু উৎপাদনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক ভূমি রাজস্ব অধিদপ্তর সর্বপ্রথমে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের উৎস্য। দুর্ভিক্ষ, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতি প্রশমনের জন্য এ ঋণ অনেকটা অভাব দূরীকরণের আকারেই প্রবর্তিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে কৃষিঋণ কৃষিখাতের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য প্রদান করা হতো। ব্রিটিশযুগে ল্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট (লিলা) এ লক্ষ্যে ১৮৮৩ সালে এবং অ্যাগ্রিকালচারাল লোনস অ্যাক্ট (আলা) ১৮৮৪ সালে প্রণীত হয়। ১৯০১ সালের দুর্ভিক্ষ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ (তথা অবিভক্ত বাংলায়) সমবায় প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব হয়। এর পেছনে কারণ ছিল অপ্রাতিষ্ঠানিক বা মহাজনী ঋণের ব্যাপক প্রভাব কমিয়ে আনা, সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০১ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত কমপক্ষে তিনটি আইন প্রণীত হয়। বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনের ক্রমবিবর্তন সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পুরানাল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

১৯৫২ থেকে ১৯৬১ সাল সময়কালে অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করর্পোরেশন ও অন্য একটি প্রতিষ্ঠান একীভূত করে অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান (এডিবিপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষিখাতে অর্থায়নেই ছিল এ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য। এ সময়ে কৃষিঋণ বিতরণ প্রথা সহজীকরণ করা হয়। সহজীকরণের লক্ষ্যে এডিবিপির ঋণের জন্য এ প্রতিষ্ঠানকে ভূমি নিবন্ধিকরণ আইন ও স্ট্যাম্প আইনের আওতামুক্ত করা হয়েছিল। বিশ শতকের সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি নতুন ধরনের সমবায় প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব হয় (আইআরডিপি, ১৯৭১)। নবসৃষ্ট সমবায় প্রথার উৎস ছিল কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন মডেল। এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুই স্তর বিশিষ্ট সমবায় প্রতিষ্ঠান প্রবর্তিত হয়। একটি ছিল গ্রাম পর্যায়ে যা কৃষক সমবায় সমিতি নামে পরিচিত। এ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে থানা পর্যায়ে গঠিত হয় থানা সেন্ট্রাল সমবায় সমিতি। এ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের সঞ্চয় দিয়ে কৃষিখাতে অর্থায়ন করা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়ে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানের এডিবিপির শাখার সকল সম্পদ ও দায়দেনা নিয়ে  বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (১৯৭২) এপ্রিল ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৭৭ সালে কৃষিখাতে অর্থায়নের উৎস প্রসারের লক্ষ্যে বিশেষ কৃষিঋণ কর্মসূচির আওতায় রাষ্ট্রয়াত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কৃষিখাতে অর্থায়ন করার প্রথা শুরু হয়। এ লক্ষ্যে একশত কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। বিশেষ কৃষিঋণ কর্মসূচি প্রবর্তন করার জন্য বাংলাদেশ প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৭৩-৭৮) মধ্যেই প্রথম সুপারিশ করা হয়েছিল। এর ফলে কৃষিখাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। আশির দশকে আইআরডিপি পুনর্গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসাবে জন্ম লাভ করে (বিআরডিবি, ১৯৮২)। আশির দশকের মধ্যবর্তী সময়ে বিকেবিকে দুইভাগে ভাগ করে রাজশাহী প্রশাসনিক একাংশে  রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯০ পরবর্তী সময়ে কৃষিঋণের বিতরণ বৃদ্ধি পায়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রায় ৯০ বিলিয়ন টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৮৪৪টি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৩০১টি শাখার মাধ্যমে কৃষিঋণ প্রদান করে থাকে। কৃষিঋণ মওকুফেরও উদাহরণ রয়েছে। ১৯৮৮ সালে মওকুফের প্রথা শুরু হয়। পরবর্তীকালে নববই দশকের প্রথমার্ধেও কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়। কৃষিঋণ প্রদানের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও রয়েছে। এ সব দুর্বলতা নিরসন আবশ্যক।

শিল্প অর্থসংস্থান শিল্প-কারখানাসমূহের প্রতিষ্ঠা, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য বা সেবা সংরক্ষণ, বণ্টন ও বিপণনের জন্য ব্যাংক, বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস শিল্প অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা করে। শিল্প অর্থসংস্থানের উৎস দেশি বা বিদেশি/আন্তর্জাতিক উভয়ই হতে পারে। দেশিয় উৎস আবার শিল্প প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ দু প্রকার। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উৎস হচ্ছে সমমূলধন, অগ্রাধিকার শেয়ার মূলধন, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা, সাধারণ সঞ্চিতি ও অবচিতি, কর, উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে সঞ্চিতি এবং লাভ-লোকসান খাতের উদ্বৃত্ত। দেশের ভিতরে শিল্প অর্থসংস্থানের বহিস্থ উৎসসমূহ হচ্ছে ডিবেঞ্চার ইস্যু এবং বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, যন্ত্রসরঞ্জাম বিক্রেতা ইত্যাদির নিকট থেকে গৃহীত ঋণ। শিল্প অর্থসংস্থানের বিদেশি/আন্তর্জাতিক উৎসসমূহের মধ্যে আছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগের মূলধন, সরবরাহ সংস্থার ঋণ, আইএফসি, বিশ্ব ব্যাংক, ওইসিডি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার ঋণ বা অনুদান এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থসহ বিদেশি অর্থের অন্যান্য প্রবাহ। উল্লিখিত দেশি বা বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে শিল্প অর্থসংস্থান কিভাবে ঘটবে, কার থেকে বা কি পরিমাণে তহবিল সংগ্রহ করা যাবে ইত্যাদি জিজ্ঞাসা ও সমস্যা যেসব বিষয়ের সঙ্গে জড়িত তা হলো শিল্পের ধরন (ক্ষুদ্র বা  কুটির শিল্প, মাঝারি শিল্প, বৃহদায়তন শিল্প কিংবা প্রচলিত প্রযুক্তির শিল্প, নতুন প্রযুক্তির শিল্প), বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তার মানসিকতা, পুঁজিবাজারের অবস্থা, প্রয়োজনীয় মূলধনের/ তহবিলের পরিমাণ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে শিল্প অর্থসংস্থানের কাঠামো মুখ্যত সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রীয় আমলাদের নিয়ন্ত্রিত পন্থায় সৃষ্ট পাকিস্তানের শিল্পখাত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। পূর্ব পাকিস্তান শিল্পে খুবই অনুন্নত ছিল এবং পাকিস্তান আমলে এ প্রদেশে উক্ত খাতে উন্নতি সামান্য হলেও শিল্পখাতের উন্নয়নে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চাদপদ ছিল। পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করে বেসরকারি খাতে শিল্পোন্নয়নের যে উদ্যোগ নেয় তার বেশিরভাগ সুবিধাই দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। আর পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পোন্নয়ন মূলত সংগঠিত হতে থাকে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে। করাচি ও ঢাকায় দুটি  স্টক এক্সচেঞ্জ চালু হওয়ার পর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিসমূহ পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের একটা সুযোগ পায়। আর দেশটির শিল্প-কারখানাগুলিকে সরকারি তহবিল যোগানোর জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় সেগুলি হলো ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট (ইউনিট) ট্রাস্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশন অব পাকিস্তান, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন।

১৯৭২ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সরকার দেশের সকল মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়। সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূলধনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ বেসরকারি খাতে চালু থাকে। এ মূলধনসীমা পরবর্তী সময়ে ৩৫ লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়। ১৯৭৪ সালে সরকার বিনিয়োগ নীতি পরিবর্তন করে এবং নতুন নীতিতে বেসরকারি উদ্যোগে শিল্পের বিকাশ সুষম করার জন্য বেসরকারি খাতে শিল্পের জন্য অনুমোদিত বিনিয়োগসীমা ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করে। এ ছাড়া বাংলাদেশে বিদেশি বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং ফলে অল্পদিনের মধ্যে শিল্প অর্থসংস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ ঘটে।

বাংলাদেশে প্রথম দিকে শিল্পকারখানাগুলিকে রেয়াতি সুদহারে ঋণ তহবিল যোগানোর কাজটি সম্পন্ন করত মূলত দেশের সরকারি মালিকানাধীন উন্নয়ন অর্থসংস্থান প্রতিষ্ঠানসমূহ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) (পূর্বতন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক এবং বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা) ঋণ প্রদান বা সমমূলধনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা বা পুরাতন শিল্পকারখানার সমন্বয়করণ, আধুনিকায়ন, প্রতিস্থাপন ও সম্প্রসারণে (বিএমআরই) দীর্ঘমেয়াদি মূলধন দেয়। ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিকে সরাসরি অথবা বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার একটি সংস্থা হচ্ছে  বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (বিসিক) ।

১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত  ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি আকারে গঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির সমমূলধনে ঘাটতি থাকলে তা মেটানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাহায্য করে। আইসিবি শেয়ার ও ডিবেঞ্চার অবলিখন, সেতু অর্থায়ন এবং অগ্রাধিকার-প্রদত্ত খাতসমূহে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিসমূহের শেয়ার ইস্যু ও বিলিকরণের কাজেও নিয়োজিত। এ সংস্থা সরাসরি শেয়ার ক্রয় এবং ডিবেঞ্চার ও বন্ড ক্রয়বিক্রয়ের মাধ্যমেও শিল্পোন্নয়নের জন্য তহবিল প্রবাহে অংশগ্রহণ করে।

বাংলাদেশে শিল্প অর্থসংস্থান মূলত ঋণ মূলধনের যোগানভিত্তিক। শিল্পখাতে স্ব-অর্থসংস্থানের ভূমিকা খুবই সীমিত। ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের ব্যাংকিং খাত সর্বমোট ৮৬৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল। এর মধ্যে ২৫৯ কোটি টাকা (৩০.০২%) দেওয়া হয়েছিল শিল্পখাতে আর মোট শিল্পঋণের ৮৫.১০% অংশই দেওয়া হয় রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিকে; বেসরকারি খাতের শিল্পকারখানা পায় মাত্র ১৪.৯%। ১৯৭৯-৮০ সালে শিল্পখাতকে দেওয়া ব্যাংকসমূহের মোট ঋণ ছিল ৯২৮ কোটি টাকা (সকল খাতে প্রদত্ত মোট ব্যাংক ঋণের ৩৮.৪%)। আর ১৯৮৯-৯০, ১৯৯৪-৯৫ এবং ১৯৯৮-৯৯-এ শিল্পঋণ-সংক্রান্ত এ তথ্যগুলির মান ছিল যথাক্রমে ৫,৪৯৫ কোটি টাকা (২৭.৬%), ৫,৮৯৫ কোটি টাকা (১৭.৮৭%) এবং ১৫,৩৫২ কোটি টাকা (২৮.৪৪%)। শিল্পখাতে প্রদত্ত ব্যাংক ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার ১৯৮২-৮৩ সালে ঋণাত্মক (-৩.২৩%) ছিল আর ১৯৮৬-৮৭, ১৯৯৪-৯৫ এবং ১৯৯৮-৯৯-এ এ হার ছিল যথাক্রমে ৪.৩৬%, ৩.৮৩% এবং ০.৪৮%। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শিল্পঋণের বৃদ্ধির হার মিশ্র প্রকৃতির ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে শিল্পঋণের হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু ২০০১ ও ২০০৯ সালের মধ্যে ব্যাংক এবং সরকারের শিল্পঋণের ক্ষেত্রে উদারনৈতিক নীতির জন্য ঋণের হার বৃদ্ধি পায়।

বাণিজ্য অর্থসংস্থান আমদানি-রপ্তানিসহ সকল প্রকার ক্রয়বিক্রয় ব্যবসায়ে নিয়োজিত সংস্থাসমূহকে মূলধন যোগান দিয়ে বাণিজ্য অর্থসংস্থান তাদের সহায়তা প্রদান করে। মজুরি ও ভাড়া পরিশোধ কিংবা কাঁচামাল ক্রয় ও এরূপ অন্যান্য কাজের জন্য কার্যচালনা-মূলধন সরবরাহ এবং পণ্য ক্রয়বিক্রয়-সংক্রান্ত লেনদেন মেটাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের প্রয়োজনীয় তহবিল যোগানোও বাণিজ্য অর্থসংস্থানের আওতায় পড়ে। দেশিয় বা বিদেশি বাজার থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রসরঞ্জাম ইত্যাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের জন্য প্রাক্-চালান অর্থসংস্থান প্রয়োজন হয়। উৎপাদনকারীরা বাণিজ্য অর্থসংস্থান ব্যবহার করে মজুরি, ভাড়া, সুদ ইত্যাদি পরিশোধ কিংবা তৈরি পণ্যসামগ্রীর মজুত সংরক্ষণ-সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর জন্য। চালান-উত্তর রপ্তানি অর্থসংস্থান সাধারণত স্বল্পমেয়াদি, এক অর্থে স্বয়ং-পরিশোধ্য এবং বিদেশি ক্রেতা মালামাল কিনে তার মূল্য পরিশোধ করতে যেটুকু সময় নেয় শুধু সে সময়ের জন্যই প্রয়োজন হয়। চালান-উত্তর স্বল্পমেয়াদি রপ্তানি অর্থসংস্থান দেওয়া হয় ধারে পণ্য রপ্তানিতে এবং সাধারণত এ ঋণের মেয়াদ হয় ১৮০ দিন পর্যন্ত। স্বীকৃত বিনিমিয় বিলএর অনুকূলে প্রদত্ত এ ঋণ এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে দেওয়া প্রাক্-চালান বা চালান-উত্তর অন্যান্য ঋণের মেয়াদ বা পরিমাণ বাড়ানো হবে কি না তা সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিনিময় বিলের প্রকৃতি এবং সেগুলির পুনর্বাট্টাকরণ সুবিধাদির ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশে বাণিজ্য অর্থসংস্থানের চারটি প্রধান পদ্ধতি হচ্ছে স্ব-অর্থসংস্থান, কোম্পানি ঋণ এবং ব্যাংক ঋণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ব-অর্থসংস্থান করা হয় অবশিষ্ট মুনাফা তথা সংরক্ষণকৃত আয় থেকে বা ব্যবসায়ীদের নিজস্ব/ব্যক্তিগত বিভিন্ন তহবিল থেকে। কোম্পানি ঋণ হচ্ছে এক কোম্পানির সঙ্গে অন্য কোম্পানির ধারে লেনদেন। ঝুঁকি থাকলে ব্যবসার কার্য প্রবাহ চালু থাকার স্বার্থে প্রায়ই এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। বহুজাতিক কোম্পানিসমূহ এটি প্রায় নিয়মিতই চর্চা করে। এ পদ্ধতিতে অর্থসংস্থানে ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা থাকে না। এসব লেনদেনে বিনিময় বিল জাতীয় কোনো দলিল তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং লেনদেন হয় যোগানদার কোম্পানি ও ক্রেতা কোম্পানির মধ্যে ধারে বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে। বাণিজ্য অর্থসংস্থানে ব্যাংক ঋণ পদ্ধতি দুভাবে কাজ করে, এক. ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্য অর্থসংস্থান-সংক্রান্ত দলিল বা বাণিজ্যিক কাগজ ক্রয় বা স্বীকৃতিদান ও সেগুলি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পুনর্বাট্টাকরণ, এবং দুই. বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থেকে সহ-জামানত নিয়ে ব্যাংক থেকে তাকে ঋণ প্রদান।

বাণিজ্য অর্থসংস্থানে বিভিন্ন বিকল্প পদ্ধতির মধ্যে কোনোটি ব্যবহূত হবে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও মুদ্রাবাজারের পরিপক্কতা, বাণিজ্য পরিচালনাকারী কোম্পানি ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসমূহের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, বাণিজ্য-সংক্রান্ত কাজে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের সামর্থ্য ও যৌক্তিকতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে নির্ভর করে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকসমূহ সকল খাতে মোট যে পরিমাণ ঋণ প্রদান করে তার ২৯.০৮% (২৫১ কোটি টাকা) দেওয়া হয় বাণিজ্য অর্থসংস্থান ঋণ হিসেবে এবং এ পরিমাণটি ১৯৭৯-৮০, ১৯৮৯-৯০ এবং ১৯৯৮-৯৯ সালে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩২.৯৩% (৭৯৬ কোটি), ৩০.৭৫% (৫,৬২৭ কোটি), এবং ২৭.২২% (১৪,৬৯৩ কোটি)। ব্যাংকিং খাত কর্তৃক বাণিজ্য অর্থসংস্থানের প্রবৃদ্ধি হার ছিল ১৯৮৬-৮৭ সালে ৬.৭৪%, ১৯৮৯-৯০ সালে (০-০.৫%), ১৯৯৪-৯৫ সালে (১৩.২৫%) এবং ১৯৯৮-৯৯ সালে ৪.৮৪%।

গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান  একক ব্যক্তি বা পরিবার কিংবা অনেক পরিবারের বসবাসের জন্য একতলা বা বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান প্রয়োজন হয়। পাকিস্তান আমলে মুখ্যত সরকারের গণপূর্ত বিভাগই কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বাসভবন নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনা করত। সরকারের অন্যান্য কোনো কোনো বিভাগও তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বাসভবন নির্মাণের স্বল্প উদ্যোগ নিত। তবে কোনো ব্যক্তিকে বা বেসরকারি আবাসন সমিতিকে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র দুটি, একটি ছিল হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (এইচবিএফসি) এবং অপরটি ছিল করাচি-ভিত্তিক একটি বেসরকারি অর্থঋণ প্রতিষ্ঠান। এইচবিএফসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালের গৃহনির্মাণ আইনের আওতায় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং এর প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকায়। প্রতিষ্ঠানটি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে ৬.৫% সুদ হারে দীর্ঘমেয়াদি (১৫ বছর মেয়াদি) ঋণ দিত। পূর্ব পাকিস্তানে এর দুটি আঞ্চলিক এবং ছয়টি উপ-আঞ্চলিক কার্যালয় ছিল এবং এসবের মাধ্যমে তা এখানকার ৭০টি শহরের মানুষদের গৃহনির্মাণ সুবিধা দিত। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সময়ে এইচবিএফসি ৩৩ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা ঋণ বিতরণ করে এবং এর সাহায্যে ঋণগ্রহীতারা ৭,০০০-এরও বেশি বাড়ি তৈরি করে। এ সময়ে এইচবিএফসির ঋণ ব্যবহার করে সমবায় সমিতিদের দ্বারা তৈরি বাড়ির সংখ্যা ১৭,০০০ ছাড়িয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের শহরগুলিতে তখন ৪০০-এর কাছাকাছি সংখ্যক গৃহনির্মাণ সমবায় সমিতি সক্রিয় ছিল। পাকিস্তান আমলে সরকার বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে নিজে বাড়ি না বানিয়ে বেসরকারি খাতকে ঋণ দিয়ে তাদের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার ওপরেই বেশি জোর দেয়। পক্ষান্তরে, সরকার ব্যস্ত থাকে মূলত বাড়ি নির্মাণের উপযোগী ছোট-বড় আবাসিক এলাকার জমি উন্নয়ন ও সেগুলি থেকে প্লট বরাদ্দ নিয়ে।

পূর্ব পাকিস্তানে এইচবিএফসির আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক যে শাখাগুলি ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেগুলির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি আদেশ নং ৭, ১৯৭৩ সেগুলিকে পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (বিএইচবিএফসি) গঠন করা হয়। এ সংস্থা ছাড়া বাংলাদেশে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি প্রায় সকল বড় বড় প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি এবং অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস (বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন) থেকে গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান হয়ে থাকে। গ্রাম এলাকায় গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থানের প্রধান উৎস হচ্ছে আবাসন সমবায় সমিতি। ২০০০ সালের মার্চ পর্যন্ত বিএইচবিএফসি ২,৭৪০ কোটি ঋণ দিয়েছে। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে সংস্থাটি কর্তৃক মঞ্জুরীকৃত ও ছাড়কৃত ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১০০৯ কোটি টাকা এবং ১১৬ কোটি টাকা। ১৯৯৯ সালে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা গৃহনির্মাণ খাতে সর্বমোট প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর দুই-তৃতীয়াংশই দিয়েছে জাতীয়করণকৃত বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ। গৃহনির্মাণ খাতে দেওয়া ব্যাংকসমূহের মোট ঋণ তাদের মোট পরিসম্পদের মাত্র ৪%। ব্যাংকিং খাতের গৃহনির্মাণ ঋণের অধিকাংশই (৫৪,০০০) দেওয়া হয়েছে বেসরকারি/ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতাদের, ১৪,০০০ দেওয়া হয়েছে আবাসন সমিতিসমূহকে। ব্যাংকিং খাত থেকে গৃহনির্মাণ সুবিধাপ্রাপ্ত তৃতীয় একটি পক্ষ হচ্ছে ঋণদাতা-ব্যাংকেই কার্যরত সকল কর্মচারী; তারা এ ঋণ বিশেষ সুবিধাজনক শর্তে পেয়ে থাকে।

গৃহনির্মাণ ও সংস্থাপন অধিদপ্তর, গণপূর্ত বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ এবং সিটি কর্পোরেশনসমূহসহ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান এবং আবাসন অবকাঠামো নির্মাণে নিয়োজিত। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রশাসনে পরিচালিত একটি নতুন ‘গৃহায়ণ তহবিল’ প্রকল্প নিম্ন ও মাঝারি আয়ের লোকদের জন্য গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থানের উদ্দেশ্যে  এনজিও এবং বেসরকারি গৃহনির্মাণ প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বল্পসুদে ঋণ তহবিল সরবরাহ করছে।

১৯৯৩ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত আইন পাস হওয়ার পর বেসরকারি গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান কোম্পানিসমূহের কাজের পথ সুগম হয়েছে। দেশে এখন গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থানে নিয়োজিত এমন ২৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। এসব কোম্পানি বাড়ি নির্মাণ, ফ্লাট বা বাড়ি ক্রয়, বাড়ি মেরামত ও সম্প্রসারণ এবং বাড়ির জন্য প্লট ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ঋণ দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশে গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থান সমবায় সমিতির ভূমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। দেশের ১,৪৫,০০০ সমবায় সমিতির মধ্যে মাত্র ১৪৪টি গৃহনির্মাণ সমিতি। এগুলির অধিকাংশই উচ্চবিত্ত লোকদের যৌথ উদ্যোগ যার মাধ্যমে তারা জমি ক্রয় করে এবং সেখানে নিজেদের জন্য বাড়ি তৈরি করে।

এনজিও তথা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসমূহ গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই সীমিত পরিসরে গৃহনির্মাণ অর্থসংস্থানে নিয়োজিত। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক, প্রশিকা, ব্র্যাক, এবং আশা। গ্রামীণ ব্যাংকের গৃহনির্মাণ ঋণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১৯৯৪ সালে এবং এটি এখন একজন ঋণগ্রহীতাকে সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়। ১৯৮৭ সালে বন্যার পর গ্রামীণ ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী বাড়ি তৈরির আবাসন ঋণ কার্যক্রম শুরু করে এবং এর আওতায় পিট-ল্যাট্রিনসহ একটি বাড়ি তৈরির জন্য ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করে। ২০০০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের দেওয়া গৃহনির্মাণ ঋণের পরিমাণ ছিল ২৭৪.৬ কোটি টাকা। প্রশিকার গৃহনির্মাণ কার্যক্রম চালু হয় ১৯৮৮ সালে এবং এ কার্যক্রম পরিচালনার ১১ বছরে প্রশিকার ঋণে ৩০,০০০ এরও বেশি বাড়ি নির্মিত হয়েছে। ৩০ জুন ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রশিকার দেওয়া গৃহনির্মাণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯.৩ কোটি টাকা। মাঝারি আয়ের গ্রামীণ লোকদের জন্য ব্র্যাক জনপ্রতি ২০,০০০ টাকা গৃহনির্মাণ ঋণ দেয়। ব্র্যাক তার নিজস্ব কর্মচারীদের জন্য গৃহনির্মাণ ঋণ দেয়, তবে ঋণের জন্য বাসভবনের আয়তন হতে হয় ৫০০ বর্গফুটের কম, ঋণের ওপর ১০% হারে সুদ দিতে হয় এবং এ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ হচ্ছে ১৫ বছর। আশা তার গৃহনির্মাণ ঋণ কার্যক্রম শুরু করেছে ১৯৮৯/৯০ সালে। আশার এ ঋণের পরিমাণ জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৯,০০০ টাকা এবং ঋণের ওপর সুদের হার ১০%।

অর্থসংস্থান ব্যবস্থা  সরকারি এবং বেসরকারি উভয় প্রকার প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের অর্থসংস্থান ব্যবস্থার উপাদান। তবে এদের মধ্যে বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, এগুলির প্রায় সবকটিই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আনুষ্ঠানিক অর্থসংস্থান ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে  বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং সকল প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অর্থসংস্থান তত্ত্বাবধান করে। অর্থসংস্থান ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। এগুলি আমানত গ্রহণ এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ঋণ বিতরণের কাজ করে থাকে। আনুষ্ঠানিক অর্থসংস্থানের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, বিনিয়োগ/মার্চেন্ট ব্যাংক, বাট্টাঘর, লগ্নিপত্র/শেয়ার বাজার, পেনশন তহবিল, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের অর্থসংস্থান ব্যবস্থা এখনও সংস্কার প্রক্রিয়ার অধীন ও উত্তরণশীল পর্যায়ে আছে। দেশের বর্তমান অর্থসংস্থান কাঠামোতে আছে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ৪৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক (৪টি এনসিবি, ২৭ দেশিয় বেসরকারি ব্যাংক ও ১৩টি বিদেশি ব্যাংক), ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ ও ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ২৩টি অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ২৭টি মার্চেন্ট ব্যাংক, ৫৫৬টি মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠান, ২টি স্টক এক্সচেঞ্জ, ১০টি ইজারা কোম্পানি, ২টি সরকারি ও ৩৯টি বেসরকারি বীমা কোম্পানি, ডাকঘর সমবায় ব্যাংক ও ডাকঘর জীবনবীমা প্রকল্প। বাংলাদেশের অর্থসংস্থান প্রতিষ্ঠানসমূহে যত পরিসম্পদ আছে তার সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে। মোট আমানতের ৬৯% শতাংশের অধিকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহই আবার ঋণ হিসেবে প্রদত্ত মোট অগ্রিমের ৭৪%-এর উৎস।

দেশের সমবায় ও ঋণ-সমবায় সমিতিসমূহও অর্থসংস্থান ব্যবস্থার অঙ্গ। বাংলাদেশে ১,৪৫,০০০ সমবায় সমিতির অধিকাংশই হচ্ছে কৃষক বা কৃষি ফার্মসমূহের সমবায়। ১৯৯৯ সালে দেশে ২০টি ঋণ সমবায় সমিতি ছিল এবং তাদের পরিসম্পদের মোট মূল্য ছিল ১৬ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। সমবায় খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক। দেশের ১,২০০ এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাও অর্থসংস্থান ব্যবস্থায় উপাদান হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক উপাদান হিসেবে আছে মহাজন, স্থানীয় বন্ধকী কারবার এবং বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন।

উদ্বর্তপত্রের দায়-খাতে নথিবদ্ধ হয় প্রচলিত ধাঁচের এমন অর্থসংস্থান ছাড়াও বাংলাদেশে এখন বিকল্প পদ্ধতির অর্থসংস্থানও চালু হয়েছে। ইজারা ও ভাড়ায় ক্রয় এর দুটি উদাহরণ। এ ছাড়া বাংলাদেশে অর্থসংস্থানের একটি বহুল প্রচলিত ধরন হচ্ছে প্রকল্প অর্থসংস্থান, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ইউনিটের জন্য তহবিল যোগানো হয় এবং অর্থসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের ব্যয়-আয় বিশ্লেষণ থেকে নিশ্চিত হতে চায় যে প্রকল্পটি সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং তা থেকে অর্জিত লাভ বা আর্থসামাজিক সুবিধা তার ব্যয়কে পূরণ করে। বাংলাদেশে এখন উন্নয়ন অর্থসংস্থান প্রায় সবটাই প্রকল্পভিত্তিক এবং এসব প্রকল্পে অর্থসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যায় অবকাঠামো খাতে, বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, সড়ক ও যোগাযোগ উন্নয়নে।

[এস.এম মাহফুজুর রহমান এবং এ.এম.এম শওকত আলী]

আরও দেখুন ব্যাংকিং ব্যবস্থা; বিনিয়োগ ব্যাংকিং; সমবায় ব্যাংকিং; ক্ষুদ্রঋণ; উন্নয়ন অর্থসংস্থান