অর্ডার অব দ্যা স্টার অব ইন্ডিয়া


অর্ডার অব দ্যা স্টার অব ইন্ডিয়া  রানী ভিক্টোরিয়া ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৮ সালে রাজকীয় ঘোষণার মাধ্যমে এই খেতাব এর প্রচলন করেন। খেতাবটি তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত:গ্র্যান্ড মাস্টার (১ জন), নাইট (২৫ জন), সম্মানসূচক নাইট (অনির্ধারিত সংখ্যা)। তৎকালীন ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের জন্য এ খেতাব প্রাপ্তি অত্যন্ত সম্মানের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হতো। মূলত ভারতের প্রজা ও বিভিন্ন ভারতীয় রাজ্যের যুবরাজদের মধ্যে যারা তাদের বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মেধার সাথে ব্রিটিশ রাজ্যের বিভিন্ন সাফল্যে অবদান রাখতেন, শুধু তাঁদেকেরই এই খেতাবে ভূষিত করা হতো।

অর্ডার অব দ্যা স্টার অব ইন্ডিয়া

ঘোষণাপত্রে এ খেতাব প্রদানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়: সম্মানসূচক খেতাব প্রদানের দ্বারা মেধা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততাকে স্বতন্ত্র ভাবে চিহ্নিত করা যুবরাজদের নিকট একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিলো, এ কারনেই অন্যদেরকে তার সমকক্ষ হওয়ার মতো করে তৈরি করার জন্য বিশিষ্ট সেবার স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে, যেনো তারা ভালো কাজে উৎসাহিত হয় এবং অন্যদের দ্বারা অনুকরণীয় হয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ নাইট খেতাব প্রদানের মাধ্যমে আমরা জনগণের স্বীকৃতির এক প্রকার প্রতীকী সাক্ষ্য দেখতে পাই। এভাবে খেতাব প্রাপ্তদের দ্বারাই ভারতে বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সরকার পরিচালনার বিষয়টি প্রস্তাবিত হয়।

১৮৫৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হয়ে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের সূচনা পর্যন্ত ভারতে ব্রিটিশ কর্তৃত্বের ভিত্তি  ছিল অনিশ্চিত। ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত শাসন করতো। তাত্ত্বিকভাবে কোম্পানি স্বয়ং ছিলো মুগল সাম্রাজ্যের প্রজা। যে কারণে, কোম্পানি ভারতের বিশিষ্ট ও অনুগত প্রজাদের মুগল রীতিতে খেতাব প্রদান অব্যহত রেখেছিলো। যেমন, নওয়াব বাহাদুর, রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর  প্রভৃতি খেতাব। স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট  প্রজা, যাদের সম্মানসূচক পোশাক পরিধান করিয়ে সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করা হতো তাঁদের মাঝে এই সম্মানজনক খেতাব আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দরবার’  নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রদানের ব্যবস্থা করা হতো। ১৮৬১ সালের ঘোষণাপত্রে পূর্ববর্তী মধ্যযুগীয়  খিলাত এর স্থানে ‘অর্ডার অব দা স্টার অব ইন্ডিয়া’ স্থান করে নেয়।

স্টার অব ইন্ডিয়া প্রবর্তনের পেক্ষাপট তৈরি হয়েছিলো ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব দ্বারা। ইস্ট-ইন্ডিয়া শাসনের অবসান ও পার্লামেন্টের মাধ্যমে সরাসরি রানীর অধীনে ভারতে শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্যে দিয়ে এ অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। সিপাহী বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিলো শাসক ও শাসিতের মধ্যেকার যোগাযোগের অভাবের ফলে

সরকার ও প্রজার মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক দূরত্বকে কমিয়ে আনার জন্য ব্রিটিশ সরকার সম্মানিত খেতাব, অর্ডার অব নাইটহুড-এর প্রবর্তন করেছিলো যাকে ‘অর্ডার অব দ্যা স্টার অব ইন্ডিয়া’ নামে অবিহিত করা হয়। খেতাবটি গ্রহীতার পক্ষে সর্বোচ্চ সাধারণ সম্মান হিসেবে বিবেচিত হতো। আদেশকৃত খেতাব মূলত নির্দিষ্ট করে সেই সকল ব্রিটিশ ভারতীয় প্রজাদের ও স্থানীয় রাজন্য শ্রেণির জন্য প্রবর্তিত হয় যাঁরা ছিলেন বৃটিশের প্রতি সর্বাধিক অনুগত।

প্রাথমিকভাবে খেতাব মাত্র পঁচিশজন ব্রিটিশ ও ভারতীয় বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত ছিলো। চার বছর পর খেতাবের কাঠামো সম্প্রসারিত করে তাকে তিনটি শ্রেনীতে বিন্যাস্ত করা হয়। খেতাবসমূহ ছিলো, নাইট গ্র্যান্ড কমান্ডার (কে.জি.সি.এস.আই), নাইট কমান্ডার (কে.সি.এস.আই), এবং কম্পানিয়ন (সি.এস.আই)। পরবর্তীকালে খেতাব গ্রহীতার সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। মুগল ঐতিহ্যকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য পুরাতন সম্মানসূচক খেতাবসমূহ কার্যকর করে রাখা হয়। ব্রিটিশ শাসনকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যে সকল স্থানীয় অভিজাত সম্প্রদায় তাঁদের সেবার শাধ্যমে সরকারকে সন্তুষ্ট করতেন, নওয়াব, রায়, খান  প্রভৃতি পূর্ববর্তী পুরানো খেতাব তাঁদেরকে প্রদান করা হতো।  স্থানীয়ভাবে দরবারের আয়োজন করে গভর্নর, লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উপর এ খেতাব প্রদানের দায়িত্ব প্রদান করা হতো।

উচ্চ পর্যায়ের খেতাব প্রদান অনুষ্ঠান বা দরবার গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হতো। সর্বোচ্চ খেতাব প্রাপ্তদের সরাসরি গভর্নর জেনারেল-এর হাত থেকে তা গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হত। প্রাদেশিক রাজধানী সমূহে দ্বিতীয় শ্রেণির খেতাব প্রদান করতো গভর্নর ও লেফটেন্যান্ট গভর্নরগণ। সর্বনিম্ন পর্যায়ের খেতাব জেলা পর্যায়ে জেলা কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে প্রদানের আয়োজন করা হতো। এ পর্যায়ের খেতাব গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ জেলা কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট-এর নিকট থেকে সম্মানসূচক সনদ গ্রহণ করতেন। সব পর্যায়ের সম্মানসূচক সনদ ব্রিটেনের রানীর নামে ইস্যু হতো। সাম্রাজ্যের সকল অধিবাসীকে অভিভূত করার লক্ষ্যে এ খেতাব প্রদান অনুষ্ঠানটি খুব জাকজমকের সঙ্গে আয়োজন করা হতো।

প্রথম পর্যায়ের খেতাব গ্রহীতাকে আলখাল্লা (Mantle), চাপরাশ (Insignia), গলাবন্ধনী (Collar) ও বাহুবন্ধনী (Pendant) পরিধান করানোর রীতি ছিলো। আলখাল্লাটি সাদা সিল্কের কাপড়ের মধ্যে হালকা নীলচে লিনেন কাপড়ের তৈরি এবং এটি পুরো শরীরকেই ঢেকে দিতো। আলখাল্লার বাম পাশের অংশে নীল ও রূপালি রঙের সুতার গুচ্ছ বা ঝালর সংযোজিত। পোশাকটিতে সোনালি সুতার কারুকাজ দ্বারা সূর্যরশ্মির আমেজ ফুটিয়ে তোলা হতো। আলখাল্লায় আরও লেখা থাকতো, হীরা দ্বারা খোদাই করে খেতাবের মূলমন্ত্র ‘স্বর্গের আলো আমাদের পথ প্রদর্শক’ ও একটি তারকা চিহ্ন। গলাবন্ধনীটিতে বড় আকারের স্বর্ণের শেকল সহকারে তালের পাতা ও পদ্ম দ্বারা অলংকৃত। আলখাল্লার মধ্যে গ্রেট ব্রিটেনের রানীর মুকুটের প্রতীকী উপস্থিতি। আরো ছিলো ঝুলানো অবস্থায় গ্রেট-ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের রানীর প্রতিকৃতি সম্বলিত উজ্জ্বল লকেট।

নাইটহুড-এর গ্রহীতাগণকে একটি অঙ্গীকারনামায় এ মর্মে সই করতে হতো যে, পদবীধারীর মৃত্যুর পর  তাঁর আলখাল্লা ও অন্যান্য সকল আনুষঙ্গিক অবশ্যই ফেরত দিবে। ভারতীয় পদবী গ্রহীতাদের নিকট এ ধরনের শর্ত অশোভন বলে মনে হয়েছিলো, কারণ, মুগলদের অধীনে প্রদত্ত্ব খিলাত কখনো ফেরত দেয়ার বিধান ছিলো না। কারণ খেতাব গ্রহণকারী তাঁর ব্যক্তিগত তোশাখানায়  খিলাতটিকে সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরবর্তী প্রজন্মের নিকট যা ছিলো রানীর নিকট থেকে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ সম্মানের চিহ্নস্বরূপ।

বাংলার অভিজাতদের মধ্যে সর্বপ্রথম অর্ডার অব দ্যা স্টার অব ইন্ডিয়া খেতাব প্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন, বর্ধমানের মহারাজা, খাজা আব্দুল গণিনওয়াব আবদুল লতিফ। ১৯৪৭ সাল থেকে রাজকীয় খেতাব ও পুরস্কার প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়। [সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন খিলাত