অপরাধ


অপরাধ ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, জাতিসত্তা, আঞ্চলিকতা, আধিপত্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রভৃতি কারণে বৃহত্তর সমাজে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হতে পারে। এ অসিষ্ণুতা শুধু সমাজেই নয়, খোদ রাষ্ট্রেও কোনো নরগোষ্ঠী, ধর্ম, জাতিসত্তার প্রতি অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হতে পারে। হিটলারের আমলে জার্মানি ইহুদি জাতির প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত, নির্যাতন ও হত্যা করেছিল। ইরান সরকার বাহাই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালানোর পর দেশ থেকে বহিষ্কার করেছিল এবং অনেক হত্যাকান্ডও চালিয়েছিল। তবে সাধারণত সরকারের ঔদাসীন্য বা নেপথ্য উস্কানির কারণে এমন ঘৃণার উদ্রেক হতে পারে যাতে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে নির্মূল করার অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। এটি হচ্ছে ঘৃণাজাত অপরাধ। যেমন ১৯৪০-এর দশকে বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘন ঘন দাঙ্গার ঘটনা, দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলায় বাঙ্গালি বিহারীদের মধ্যে দাঙ্গা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সুন্নী ও আহমদীয়াপন্থী মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা। ঘৃণাজাত অপরাধের সবচেয়ে বড় প্রকাশ হচ্ছে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে একে অপরকে নির্মূল করার প্রবণতা। এ অপরাধ এখন একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। অপরাধ মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা বা সমুন্নত রাখার জন্য অফিস আদালতে ও জনাকীর্ণ জায়গায় বোমা হামলা, হত্যাকান্ড, শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীক বিনষ্টিকরণ প্রভৃতি হলো এ প্রকার ঘৃণারই ফল।

অপরাধ তত্ত্বমতে, অপরাধ ঘটে কয়েকটি কারণে, যথা- রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থা ও উৎপীড়ন, সুবিচার নিশ্চিত করতে আদালতের ব্যর্থতা, অসহিষ্ণু শক্তিমানের নিকট সমাজের অসহায়ত্ব। তবে এসব কারণ না থাকলেও অপরাধ ঘটে থাকে, কেননা, কোনো কোনো ব্যক্তির মধ্যে স্বভাবগতভাবে অপরাধ প্রবণতা বিদ্যমান। শেষোক্ত ব্যক্তিদের সনাক্ত করে তাদের স্বভাবগত অপরাধ প্রবণতার বিষয়টি চেতনায় আনার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের সাধারণ অভিমত। শিল্প সমাজ থেকে আধুনিক তথ্য সমাজে উত্তরণের মধ্যে আমরা আধুনিক সভ্যতার বিকাশ লক্ষ্য করি। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার একজন সমাজ সচেতন নাগরিকের জন্য এবং সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং অর্থনীতির ফলপ্রদ ও সূক্ষ্ম বিকাশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তবে প্রযুক্তির প্রসার কেবল শিল্প সমাজের ক্ষমতাকেই এগিয়ে নিচ্ছে না বরং তা নতুন ধরনের বার্তা বহন করছে যা পূর্বে সমাজে ছিলনা। আজ শুধু উন্নত বিশ্বই নয়, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও কমবেশি বৈশ্বিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সাধারণভাবে অপরাধ বলতে সমাজ কর্তৃক শস্তিযোগ্য কোনো অন্যায় আচরণকে বুঝায়। এ সংজ্ঞার একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে এতে সমাজের জটিল সমস্যাকে আড়াল করা হয়। কোনো সমাজই চিরস্থির নয়। আসলে প্রতিনিয়ত সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। একইভাবে অপরাধ প্রবণতা ও এর ধরনও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। আবার সমাজভেদে অপরাধ আচরণের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন সিঙ্গাপুরে চুইংগাম বিক্রি করা একটি অবৈধ কাজ কিন্তু আমেরিকানদের কাছে তা অচিন্তনীয়। সুতরাং অপরাধ সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে হলে একটি বিশেষ সমাজ কোনো কাজগুলোকে অপরাধ হিসাবে বিচার করে তা দেখা অপরিহার্য।

সামাজিক সংজ্ঞানুসারে সমাজে প্রচলিত আদর্শসমূহের যে কোনো লঙ্ঘণকে অপরাধ বলে। অর্থাৎ অপরাধ সমাজ বিরোধী কাজ। মানুষের মধ্যে কিছু মানবীয় আচরণ আছে যা অপরাধ আইনের পরিপন্থী নয় কিন্তু সামাজিকভাবে নিন্দনীয় বা সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা বা অনুশাসনের পরিপন্থী। ফলে তা সামাজিকভাবে ঘৃণিত ও দন্ডনীয়।

অপরাধের সমাজতাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা নানা ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকেন। যেমন: সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম মনে করেন, অপরাধ একটি সামাজিক ঘটনা। এটি সমাজ ব্যবস্থার একটি ‘স্বাভাবিক’ রূপ। যদিও সমাজভেদে তা স্বল্প বা তীব্র মাত্রার হয়ে থাকে। তিনি মনে করেন সমাজে টিকে থাকার জন্য অনেক সময় অপরাধের আশ্রয় নিতে হয়। এটা সমাজ কাঠামোর দুর্বলতার ফল। সমাজবিজ্ঞানী পার্ক ও বার্জেস শিকাগো স্কুল মতবাদের আলোচনায় দেখান যে, সমাজে বিদ্যমান দলগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বিচ্যুত আচরণের জন্ম দেয়। আর এটা তৈরি হয় বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতি থেকে। বিচ্যুতির আদর্শহীনতা তত্ত্বের ব্যাখ্যায় সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন সমাজে সংস্কৃতি ও সমাজ কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান বৈপরিত্য ও দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন। সমাজে সফলতা অর্জন করা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও  বাস্তবে ততটা নয়। ফলে সমাজের অনুমোদিত নিয়মের বাইরে অনেকেই নানা অসমর্থিত আচরণের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করে থাকে। টার্ডে, সাদারল্যান্ড প্রমুখ সমাজবিজ্ঞানী অপরাধকে একটি শিক্ষণজাত ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আবার সমাজবিজ্ঞানী রেইস, টবি, রেকলেস প্রমুখ মনে করেন অপরাধ হচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে সামাজিকীকরণের ফলাফল। তবে অপরাধের সামাজিক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। যেমন: কোনো একক সমাজের আদর্শসমূহ  দলগুলোর মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি করে; আদর্শসমূহ সবসময়ই ব্যাখ্যামূলক; আদর্শসমূহ সময় ও স্থানের প্রেক্ষিতে পরিবর্তন হয়।

অপরাধের আইনগত সংজ্ঞা  সাধারণত অপরাধ আইন বা দন্ডবিধি উদ্দেশ্যমূলকভাবে লঙ্ঘনকরাকে আইনগত দৃষ্টিকোণ হতে অপরাধ বলা হয় এবং এর জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক শাস্তির বিধান রয়েছে। অপরাধের আইনগত সংজ্ঞার একটি বড় সুবিধা হলো এটি অপরাধের সামাজিক সংজ্ঞা হতে অনেক সংক্ষিপ্ত ও দ্ব্যর্থক। সুতরাং আইনগত সংজ্ঞানুযায়ী- (ক) অপরাধ হচ্ছে এক ধরনের আচরণ এবং (খ) ওই আচরণটি বিদ্যমান অপরাধ আইনকে অমান্য করে।

অপরাধের উপাদানসমূহ  কোনো আচরণকে অপরাধ হিসেবে চিহিূত করার ক্ষেত্রে অপরাধবিজ্ঞানীরা সাতটি উপাদানের কথা বলে থাকেন। যথা- ক্ষতি: কোনো আচরণ বা কাজকে অপরাধ হতে হলে তার একটি বাহ্যিক ফলাফল থাকতে হবে। ক্ষতি দুই ধরনের হয়ে থাকে- শারিরীক ও মৌখিক। আইনগত বৈধতা: এর দুইটি দিক রয়েছে। প্রথমত, ক্ষতি যা অপরাধ আচরণকে নির্দেশ করে তা অবশ্যই আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, অপরাধ আইনটি অবশ্যই বিগতদিন হতে কার্যকর হবে না। অপরাধমূলক কার্যসম্পাদন: অপরাধমূলক আচরণ হতে হবে। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত বা দোষীমন নিয়ে কোনো দায়িত্বহীন কাজ যা অন্যের ক্ষতি করা। দোষী মন: অপরাধমূলক উদ্দেশ্য থাকতে হবে। এটা অপরাধের মানসিক দিক। কার্যকারণ সম্পর্ক: অপরাধের আরেকটি আইনগত উপাদান হলো আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ক্ষতিকর কাজ এবং দোষীমন-এর মধ্যেকার কার্যকারণ সম্পর্ক। অন্য কথায় অপরাধমূলক আচরণটি দীর্ঘসূত্রিতা ব্যতীত সরাসরি ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়। ঐক্যমত্য: কোনো আচরণকে অপরাধ হতে হলে অপরাধমূলক কাজ ও উদ্দেশ্যের মধ্যে ঐক্যমত থাকতে হবে। অর্থাৎ অপরাধ আচরণ ও অপরাধ উদ্দেশ্য একসাথে ঘটতে হবে। শাস্তি: অপরাধের সর্বশেষ উপাদানটি হলো শাস্তি। কারণ শাস্তি প্রদনের হুমকি প্রদান ব্যতীত কোনো আইন প্রয়োগযোগ্য হবে না।

অপরাধের শ্রেণিবিভাগ সমাজবিজ্ঞানী এবং অপরাধবিজ্ঞানীরা অপরাধ আচরণকে নানা দৃষ্টিকোণ দেখেন। বস্ত্তত এটি নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট অপরাধ আচরণের মাত্রার ওপর। তবে সাধারণভাবে অপরাধ আচরণকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো- সহিংস আপরাধ: এ ধরনের অপরাধ মূলত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয়ে থাকে। এ সম্পর্কীয় অপরাধ আচরণগুলো হলো-

খুন  আইন বহির্ভূতভাবে কোনো মানব সন্তানকে হত্যা করা; যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ: কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন করা। প্রহার বা আঘাত: কোনো ব্যক্তি শারীরিকভাবে অন্য কোনো ব্যক্তিকে আঘাত করে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো কাজ করে যাতে এ বিশ্বাস জন্ম নেয় যে এর মাধ্যমে তাকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্য। ডাকাতি: জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে কোনো ব্যক্তির নিকট হতে কোনো সম্পদ, অর্থ অথবা ব্যক্তিগত কোনো মালামাল ছিনিয়ে নেয়া।

সম্পত্তি বিষয়ক অপরাধ  অপরাধমূলক কর্মকান্ডের একটি সাধারণ রূপ হচ্ছে সম্পত্তি বিষয়ক অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর মূল লক্ষ্য থাকে যে কোনো প্রকারেই হোক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া অথবা অন্যের সম্পদের হানি করা। যেমন- পকেট মারা, দোকানে চুরি, সিদেঁল চুরি, মোটর গাড়ি চুরি, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি।

জন শৃংখলা বিষয়ক অপরাধ  এটি পূর্বে আলোচিত ঐক্যমত্য ভিত্তিক ধারণার সাথে সম্পর্কিত। প্রত্যেক সমাজেই জনসাধারণের মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিরোধী কাজ হয়ে থাকে, যা আইনসিদ্ধ নয়। যেমন- জনসম্মূখে মদ্যপান, পতিতাবৃত্তি, জুয়া খেলা, অবৈধ মাদক ব্যবহার প্রভৃতি। এধরনের অপরাধকে অনেক সময় শিকারহীন অপরাধও বলা হয়। কারণ এগুলো কেবলমাত্র অপরাধীর নিজেরই ক্ষতি করে থাকে।

ভদ্রবেশী অপরাধ সাধারণত ব্যবসাবাণিজ্যের সাথে সম্পর্কিত অপরাধই ভদ্রবেশী অপরাধ হিসেবে বহুল পরিচিত। ব্যাপক অর্থে ভদ্রবেশী অপরাধ বলতে কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংঘটিত অবৈধ বা ধারাবাহিক কর্মকান্ড যেখানে কিছু অহিংস উপায়ে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সুবিধা নেয়া হয়। যেমন-তহবিল তছরুফ, ক্রেডিট কার্ড ও চেক জালিয়াতি, বীমাপত্র জালিয়াতি, ঋণের দলিলের জালিয়াতি, ঘুষ, কর ফাঁকি প্রভৃতি। কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গি হতে বিচার করলে কিছু সম্পত্তি বিষয়ক অপরাধ ভদ্রবেশী অপরাধের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়।

সংঘবদ্ধ অপরাধ  ভদ্রবেশী অপরাধের ক্ষেত্রে বৈধ কর্মচারীরা অবৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে সুবিধা অর্জন করে। যেমন- ব্যাংকের একজন ক্যাশিয়ার ব্যাংকের একজন বৈধ কর্মচারী হিসেবে তহবিল জালিয়াতির সাথে যুক্ত হতে পারে না। অপরদিকে, সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে অবৈধ সংগঠনগুলোই অবৈধ কাজের সাথে যুক্ত থাকে। যেমন- চোরাচালান, মাদকদ্রব্যের ব্যবসা, পতিতাবৃত্তি, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক লাভের জন্য ভয় দেখানো প্রভৃতি।

আধুনিক প্রযুক্তিগত অপরাধ  প্রাত্যহিক জীবনে কম্পিউটারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সাথে সরাসরি জড়িত নতুন ধরনের অপরাধই হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিগত অপরাধ। উদাহরণ হিসেবে ইন্টারনেট ভিত্তিক সাইবার অপরাধের কথা বলা যায়। সাইবার অপরাধের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন- ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ: অশ্লীল বিষয় বা পর্ণোগ্রাফি বিক্রয়, বণ্টন ও প্রকাশ, সাইবার স্টকিং, সাইবার হয়রানি প্রভৃতি। সম্পত্তির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ: হ্যাকিং, ক্র্যাকিং, পাইরেসি, ভাইরাস প্রভৃতি। সরকারের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ: সাইবার সন্ত্রাসবাদ।

অপরাধ ও শাস্তি সব সমাজেই অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে একই ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে বিভিন্ন শাস্তির বিধান বিদ্যমান। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে শাস্তির ধরন ধর্মীয় নিয়মনিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক দেশের শাস্তির বিধান তৈরি হয় রাষ্ট্রীয় দর্শন ও নীতি থেকে। তবে সব রাষ্ট্রেই শাস্তি ব্যাপারে কিছু মূল নীতি থাকে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শাস্তির খাতিরে শাস্তি দেয়া হয় বিরল। শাস্তির উদ্দেশ্য থাকে একদিকে অপরাধজনিত ক্ষতি আদায় করা, আদায়যোগ্য না হলে অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থকে মানসিক প্রবোধ দেয়া, অপরদিকে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে অপরাধ বিষয়ে অন্যদের সাবধান করা। প্রাচীনকাল থেকে উনবিংশ শতকের বিশের দশক পর্যন্ত অপরাধ ও শাস্তি সংজ্ঞায়িত হয়েছে মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন দ্বারা। অপরাধ ও শাস্তি ব্যাপারে  বিভিন্ন ধর্মের জন্য বিভিন্ন অনুশাসন থাকায় একই সমাজের সদস্য হওয়া সত্তেও একই ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন ধর্মের অপরাধীর জন্য শাস্তি ছিল বিভিন্ন ধরনের।

বাংলাদেশে অপরাধ প্রবণতা, ১৯৪৭-১৯৭১ ১৯৪৭ সালের পূর্বে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে খুব সাধারণ ও পৌনঃপুনিক আইনগত নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। ভারত বিভাগের পর তা ক্রমশ কমতে থাকে। পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে ঢাকা, বরিশাল, সিলেট ও বগুড়াতে পুনরায় দাঙ্গা দেখা দেয়। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ প্রশাসনের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, এ সময় বেআইনি সমাবেশসহ বাংলাদেশে মোট ৩,৩৮৩ টি দাঙ্গা হয়। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের বিভক্তি পুলিশকে এক নতুন অপরাধ পরিস্থিতির সম্মুখীন করে। সেটি হলো সীমান্ত অপরাধ। সে সময় সীমান্ত চিহিূত না থাকায় সীমান্তে প্রায়ই গোলযোগ দেখা দেয়। চোরাকারবারী ও বেআইনি মালামাল পাচার ব্যাপক আকার ধারণ করে।

তদুপরি রাজনীতির সাথে সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে অন্যান্য অপরাধ যেমন- শ্রমিক অসোন্তষ, শিল্প ধর্মঘট, জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ আন্দোলন ইত্যাদি। সে সময় পুলিশের বার্ষিক প্রতিবেদনে অপরাধের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা: প্রথম শ্রেণি: রাষ্ট্র, শান্তি, নিরাপত্তা এবং ন্যায় বিচারের পরিপন্থী মারাত্বক অপরাধ; দ্বিতীয় শ্রেণি: ব্যক্তির বিরুদ্ধে মারাত্বক অপরাধ; তৃতীয় শ্রেণি: ব্যক্তি এবং সম্পত্তি অথবা সম্পত্তির বিরুদ্ধে মারাত্বক অপরাধ; চতুর্থ শ্রেণি: ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছোটখাটো অপরাধ; পঞ্চম শ্রেণি: সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতিমূলক ছোটখাটো অপরাধ; ষষ্ঠ শ্রেণি: বিশেষ এবং স্থানীয় আইনের বিরুদ্ধে অপরাধ। ১৯৪৮ ও ১৯৫০ সালে দেশে রাহাজানি ও ডাকাতির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৬-৫৭ সালে দেশে খুন, ডাকাতি, দলবদ্ধ ডাকাতি, চুরি প্রভৃতি ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং এর কারণ হিসেবে সমকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আইনি দুর্বলতাকে চিহিূত করা হয়।

অপরাধ প্রবণতা ১৯৭১ থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী বছরগুলোতে দেশে চুরি, ডাকাতি, খুন, লুণ্ঠন, চোরাকারবারী, চর দখল ও ভূমি সংক্রান্ত নানা অপরাধ বৃদ্ধি পায়। মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা ও নানা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এর জন্য দায়ী। পরবর্তীকালে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দীর্ঘ সামরিক শাসন ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী দলের আবির্ভাব ও আন্তঃকোন্দল বৃদ্ধির কারণে দেশে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।

১৯৯০’র দশক পরবর্তী সময়ে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির আবির্ভাব, ডিজিটাল সংস্কৃতির বিকাশ, জনসংখ্যা ও বেকারত্ব বৃদ্ধি দেশের অপরাধ জগতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। অপরাধের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি এর সংখ্যাও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের অপরাধ সংক্রান্ত পুলিশ প্রতিবেদন ও অন্যান্য গবেষণাগুলো পর্যলোচনা করলে দেখা যায় যে, সময় ও স্থানভেদে দেশে অপরাধ আচরণে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন- দেশের সমুদ্র উপকূলীয় জেলাগুলোতে (ঝালকাঠি, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফেনী ও কক্সবাজার) এবং জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা যেমন- ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ প্রভৃতি হাওরসমৃদ্ধ জেলায় অপরাধমূলক কর্মকান্ড বেশি লক্ষ্য করা যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এখানে মাদকদ্রব্য পাচার, মানি লন্ডারিং, চাঁদাবাজি, ভাড়াটে খুনি দ্বারা সংঘঠিত খুন প্রভৃতির মত অপরাধ যেমন সংঘটিত হচ্ছে তেমনি মানুষ পাচার, ডাকাতি, দুর্নীতি, কালোবাজারি, রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ, অপহরণ প্রভৃতি অপরাধও ঘটছে।

বিদেশি মাদক পাচারের একটি ট্রানজিট দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পুলিশের রিপোর্ট আছে। আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড কর্তৃক ২০০৭ সালে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হতে ইউরোপে হেরোইন পাচারের মূল ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত মাদকের আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানের ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। বাংলাদেশে হেরোইন পাচারের বড় তিনটি পথ রয়েছে যার উৎস প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমার। অনুমান করা হয় যে, বাংলাদেশে কমপক্ষে ১,০০,০০০ লোক মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত। তাছাড়া কম্পিউটার সফট্ওয়ার নকল করার অপরাধেও বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম বলে মনে করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অপরাধের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে সন্ত্রাস। সন্ত্রাস অপরাধ কয়েক রকমের, যথা রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ধর্মীয় সন্ত্রাস, আদর্শিক সন্ত্রাসবাদ, উপজাতীয় সন্ত্রাস ইত্যাদি। রাষ্ট্রের কয়েকটি শাখা সন্ত্রাসী অপরাধের শিকার যথা, ক্রয়, জ্বালানি, যোগাযোগ, আইন-শৃংঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, তথ্য ও প্রযুক্তি খাত, শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য। তাত্ত্বিকভাবে সন্ত্রাস বিকাশের জন্য দায়ী বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সাথে সহজ যোগাযোগ, আইন-শৃঙ্খলরক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের দুর্বলতা এবং দুর্নীতি, অদক্ষ সীমান্ত পাহারা, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অসাম্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব প্রভৃতি। তাছাড়া বর্তমানে নারী ও শিশুদের প্রতি নানা সহিংস অপরাধ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন-ইভ টিজিং, ধর্মীয় ফতোয়া প্রদান, ধর্ষণ, খুন, অনৈতিক সম্পর্ক অথবা পারিবারিক অশান্তির কারণে শিশু খুনসহ আত্মহত্যা প্রভৃতি।

সারণি  ২০০৫-২০০৯ সালে পুলিশের তালিকা অনুযায়ী দেশে সংঘটিত অপরাধের পরিসংখ্যান (তালিকাভুক্ত মামলার সংখ্যা ২০০৫-২০০৯)।
ক্রমিক নং অপরাধের নাম ২০০৫ ২০০৬ ২০০৭ ২০০৮ ২০০৯
ডাকাতি ৭৯৬ ৭৯৫ ১০৪৭ ৮৮৫ ৭৬৪
লুটতরাজ ৮৯৮ ৮৪৩ ১২৯৮ ১৫৮৩ ১২৯৮
হত্যা ৩৫৯২ ৪১৬৬ ৩৮৬৩ ৪০৯৯ ৪২১৯
দ্রুতবিচার আইন ১৮১৪ ১৬৩৮ ১৯৮০ ১৭০০ ১৮১৭
দাঙ্গা ৫৭০ ৫৭০ ২৬৩ ২০৩ ১১২
নারী নির্যাতন ১১৪২৬ ১১০৬৮ ১৪২৫০ ১৪২৮৪ ১২৯০৪
শিশু নির্যাতন ৫৫৫ ৬৬২ ৯৬৭ ৯৬২ ১০৯৩
অপহরণ ৭৬৫ ৭২২ ৭৭৪ ৮১৭ ৮৫৮
পুলিশি নির্যাতন ২৪০ ৩৩৭ ২৭৮ ২৯৬ ৩৫৭
১০ সিদেল চুরি ৩২৭০ ২৯৯১ ৪৪৩৯ ৪৫৫২ ৩৪৫৬
১১ চুরি ৮১০১ ৮৩৩২ ১২০১৫ ১২১৮৮ ৯১৭১
১২ অস্ত্র আইন ১৮৩৬ ১৫৫২ ১৭৪৬ ১৫২৯ ১৭২১
১৩ বিষ্ফোরক ৫৯৫ ৩০৮ ২৩২ ২৩৯ ২২৭
১৪ মাদক ১৪১৯৫ ১৫৪৭৯ ১৫৬২২ ১৯২৬৩ ২৪২৭২
১৫ চোরাচালান ৪৩৩৪ ৪৭৩৪ ৫২০২ ৭৯৬২ ৭৮১৭
১৬ অন্যান্য ৭০০৪৬ ৭৬৩৮১ ৯৩২২৪ ৮৭৪১৭ ৮৭০২২
মোট ১২৩০৩৩ '১৩০৫৭৮ ১৫৭২০০ ১৫৭৯৭৯ ১৫৭১০৮

উৎস www.police.gov.bd

তালিকায় দেখা যায় যে, কোনো কোন অপরাধ আগের চেয়ে বর্তমানে কম ঘটে, যেমন দাঙ্গা, বিস্ফোরক, অস্ত্র আইন লঙ্ঘন, লুটতরাজ ইত্যাদি। আবার কোনো কোন অপরাধ মোটামুটি অপরিবর্তিত। যেমন ডাকাতি, হত্যা, অপহরণ, সিঁদেল চুরি ইত্যাদি। কিন্তু কোনো কোন অপরাধ আগের চেয়ে উর্ধ্বমুখী, যেমন, মাদক, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, চোরাচালান, পুলিশী নির্যাতন ইত্যাদি। দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধ সংঘটনে লক্ষনীয় তারতম্য অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। তাত্ত্বিকভাবে এটা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসনে মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষণ।  [মুহাম্মদ আব্দুল কাদের মিয়া]