অনুশীলন সমিতি


অনুশীলন সমিতি বিশ শতকের প্রথমভাগে বাংলায় গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনগুলির মধ্যে একটি। এ সমিতি ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন উচ্ছেদ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। বিশ শতকের প্রথম দশকে বাংলার যুবকদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন- এ তিন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিবেদিত অসন্ত্রাসী ক্ষুদ্র যুবসংগঠন সমূহের মধ্য থেকে বিপ্লবী দলগুলির জন্ম হয়েছে বলে ধরা যায়।  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,  স্বামী বিবেকানন্দঅরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক বিকশিত এ ধারণা হিন্দু ধর্মের শাক্ত মতবাদের দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁরা হিন্দুদেরকে আত্মিক, শারীরিক ও বুদ্ধিতে বলিষ্ঠ হওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁদের চিন্তা-চেতনাকে কার্যকর করার জন্য প্রকৃত বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ শুরু হওয়ার বহুপূর্ব হতেই মানসিক যোগাভ্যাস ও শারীরিক ব্যায়ামের জন্য গ্রাম ও শহর এলাকায় অনুশীলন সমিতি নামে অসংখ্য যুব সংগঠন গঠিত হয়।

অনুশীলন সমিতি কোনো সময় হতে বিপ্লবী কার্যকলাপ শুরু করেছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এখন স্বীকৃত যে, ১৯০৫ সাল থেকে অনুশীলন সমিতি বিপ্লবী কার্যকলাপ শুরু করে। যে সব আশু ঘটনাবলির কারণে সন্ত্রাসবাদ হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল সেগুলি হলো লর্ড কার্জনের অপ্রিয় শিক্ষা সংস্কার ও বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)। ১৯০৬ সালের মার্চ মাসে সমিতির সদস্যবৃন্দ যুগান্তর নামে একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা প্রকাশনার কাজ শুরু করে। এতে বিদ্রোহের কথা খোলাখুলিভাবে প্রচার করা হয়। সারা বাংলায় সমিতির শাখা স্থাপিত হয়।

১৯০৫ সালে ঢাকায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বিপিনচন্দ্র পালের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শ্রোতাদেরকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে এবং এতে পূর্ববঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিপিনচন্দ্র পালের বক্তৃতার পর ঢাকা সরকারি কলেজের এককালের শিক্ষক ও পরবর্তী সময়ে ঢাকায় ‘ন্যাশনাল স্কুলে’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক পুলিনবিহারী দাসের নেতৃত্বে ৮০ জন হিন্দু যুবক ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায়  ঢাকা অনুশীলন সমিতি গঠন করে। এর প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকাতে। পুলিনবিহারী দাস কর্তৃক ঢাকা অনুশীলন সমিতি পরিচালিত হয়।

সমিতি ও স্বদেশী আন্দোলনের লক্ষ ও কার্যপদ্ধতি প্রায় একই রকম ছিল। কলকাতা অনুশীলন সমিতি ও ঢাকা অনুশীলন সমিতি অনেকটা রাশিয়া ও ইতালির গুপ্ত সংগঠন গুলির আদলেই গড়ে উঠেছিল। উনিশ শতকে শেষে ও বিশ শতকে প্রথমদিকে সন্ত্রাসী আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র ১৯০২ সালে কলকাতা অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। বরোদার মহারাজার আর্মি বাহিনী থেকে সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত তরুণ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও অরবিন্দ ঘোষের ছোট ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ তাঁকে এটি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কলকাতা অনুশীলন সমিতি সদ্যসদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার মাধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল এবং ১৯০৭ বা ১৯০৮ সাল পর্যন্ত এ সমিতি তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করে নি।

১৯০৭ সাল হতে অনুশীলন সমিতির সদস্যগণ বিপ্লবী কর্মকান্ডে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নব প্রতিষ্ঠিত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর যে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন সেটি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর অল্প কয়েকদিন পর ২৩ ডিসেম্বর তারা ঢাকার প্রাক্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. অ্যালেনকে হত্যা করার চেষ্টা করে। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল তারা ভুলবশত দুজন নিরপরাধী মহিলা মিসেস ও মিস কেনেডিকে হত্যা করে। অথচ তাদের টার্গেট ছিল কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট ও পরবর্তীকালে বিহারের মুজাফ্ফরপুরের জেলা জজ ডগলাস কিংসফোর্ড। মুজাফ্ফরপুরের ঘটনার সাথে জড়িত প্রফুল্ল চাকি পরবর্তীসময়ে ধরা না দিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং তাঁর সহযোগী ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়েন ও বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। বাংলার বিপ্লবী সন্ত্রাসের ইতিহাসে মুজাফ্ফরপুরের হত্যাকান্ড একটি বিখ্যাত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। এ ঘটনার পর থেকে ক্ষুদিরাম বসুপ্রফুল্ল চাকী বাংলার জনগণের নায়কে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার মানিকতলার বাগানে একটি বোমা তৈরীর কারখানা আবিষ্কার হয়। অনুশীলন সমিতির জনৈক নেতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে তথাকথিত আলীপুর ষড়যন্ত্র মামলার আওতায় বিচারাধীনে আনা হয়।

আলীপুর মামলার কারণে ধরপাকড় ও পুলিশি হানা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। ফলে অনুশীলন সমিতিতে বিভাজন দেখা দেয়। যদিও সমিতিগুলি একটির থেকে অন্যটি স্বাধীন ছিল, তবুও প্রমথনাথ মিত্র, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং পুলিনবিহারী দাসের যৌথ পরিচালনায় সেখানে কেন্দ্রীয় অ্যাকশন কমিটির মতো একটি কমিটি ছিল। সরকার সমিতিগুলিকে দুটি প্রধান দলে চিহ্নিত করে- যুগান্তর দল ও ঢাকা অনুশীলন দল। মোটামুটিভাবে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের সন্ত্রাসীদেরকে যুগান্তরের নামানুসারে যুগান্তর দল এবং পূর্ববঙ্গের সন্ত্রাসীদেরকে ঢাকা অনুশীলন সমিতি বলে চিহ্নিত করে। পশ্চিমবঙ্গের বৈপ্লবিক কর্মকান্ড ১৯১০ সালের পর হতে কিছু কালের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন থেকে বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র পূর্ববঙ্গে স্থানান্তরিত করা হয়।

সাংগঠনিকভাবে ঢাকা অনুশীলন সমিতি পুলিনবিহারী দাসের পরিচালনাধীনে একটি স্বাধীন সংগঠন ছিল। কিন্তু প্রমথনাথ মিত্রের কলকাতা অনুশীলন সমিতির সঙ্গে এর সংযোগ ছিল এবং পুলিনবিহারী দাস কলকাতা গেলে সেখানেই অবস্থান করতেন।

হিন্দু আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মের প্রতি আগ্রহ সমিতিকে গতিশীল শক্তি প্রদান করে। সদস্যদের অধ্যয়ন তালিকায় প্রধানত হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীভিত্তিক রচনাই বেশি ছিল। তাদের জন্য সুপারিশকৃত বইগুলির মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের গ্রন্থসমূহকে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে। অনুশীলন সমিতিতে কেউ যখন ভর্তি হতো, তখন শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য গীতা ব্যবহার করা হতো। এ বিশেষ কারণেই কোনো মুসলমান অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিতে পারত না।

ঢাকা অনুশীলন সমিতি শীঘ্রই এর কলকাতার মূল সংগঠনকে গুরুত্বহীন করে দেয়। পূর্ববঙ্গের অন্যান্য জেলাসমূহে এটি বিস্তার লাভ করে এবং ১৯৩২ সালের মধ্যে এর শাখার সংখ্যা হয় ৫০০। পুলিনবিহারী দাসের সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য ঢাকা অনুশীলন সমিতি দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল এবং প্রধান অবস্থানে ছিল। বরোদির (ঢাকা জেলা) ভূপেশচন্দ্র নাগ পুলিনবিহারী দাসের যোগ্যতম সহকর্মী ছিলেন এবং পুলিনবিহারী দাস গ্রেপ্তার হলে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। যশোরের শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ছিলেন একজন বিপ্লবী এবং শুরু থেকেই ঢাকা অনুশীলন সমিতির ‘শাখাসমূহের পরিদর্শক’ ছিলেন। এসব সমিতির সদস্যবৃন্দ অধিকাংশই ছিল হিন্দু ভদ্র পরিবার হতে আগত স্কুল ও কলেজের ছাত্র। ভর্তিকৃত সদস্যদের দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়, যথা: সন্ন্যাসী ও গৃহী (পরিবারের লোক)।

কাজের জন্য বিপ্লবীদের তহবিলের প্রয়োজন ছিল। ব্রিটিশ রাজের প্রতি অনুগত লোকদের বাড়ি লুণ্ঠন করে তারা তহবিল সংগ্রহ করার চেষ্টা করত। পুলিন দাস ঢাকায় ন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় মনে করেছিলেন যে, এটি হবে বৈপ্লবিক শক্তি গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। পুলিনবিহারীর বৈপ্লবিক তৎপরতার সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের অনুশীন পদ্ধতি। তাঁর ছাত্ররা প্রথমে লাঠি ও কাঠের তরবারি দিয়ে অনুশীলন করত। পরে তারা অনুশীলন করত ছোরা ও পিস্তল দিয়ে।

পুলিনবিহারী দাস যখন গ্রেফতার হন এবং ডাকাতির দায়ে অভিযুক্ত করে তাঁকে যখন যাবজ্জীবন নির্বাসন দেওয়া হয়, বাহ্যত তখন থেকেই ঢাকা অনুশীলন সমিতি ভেঙ্গে যায়। এর পর সমিতি সম্পূর্ণরূপে গা ঢাকা দেয় এবং মফস্বলের সমিতির সদস্যদের সঙ্গে সাময়িককালের জন্য সমস্ত যোগাযোগ স্থগিত করে দেয়। কিন্তু ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ও প্রতুলচন্দ্র গাঙ্গুলির নতুন নেতৃত্বে সমিতি শীঘ্রই তার কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করে। ১৯১৩ সালের বিখ্যাত বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলা প্রমাণ করে যে, শুধু বরিশাল জেলাতেই সমিতির শত শত বিপ্লবী অনুসারী ছিল।

প্রথম মহাযুদ্ধ পর্যন্ত যুগান্তর দলের সঙ্গে ঢাকা অনুশীলন সমিতির সম্পর্ক ছিল দুর্বল। মহাযুদ্ধের পরিস্থিতি বাংলার সন্ত্রাসীদেরকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার সুযোগ করে দেয়। যুগান্তর বৈপ্লবিক কেন্দ্রসমূহের জোট (ফেডারেশন) হিসেবে সারাদেশে আবার আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু সরকার সন্দেহভাজনদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখত। নিরাপত্তা গোয়েন্দাদেরকে সহজেই স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োজিত করা যেত বলে তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে সন্দেহভাজন লোকজন কদাচিৎই চলাফেরা করতে পারত। অসহযোগ আন্দোলনের সময় যুগান্তর দল গান্ধীর সাথে সহযোগিতা করে, কিন্তু ঢাকা অনুশীলনদল তাদের বৈপ্লবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯২৪ সালে মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় জেলখানায় উভয় দলের সন্ত্রাসী হাজতিদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নেতাদের একটানা বন্দিত্বের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে এ ঐক্য কার্যকর করা যায় নি।

মাস্টারদা সূর্যসেন পূর্ববঙ্গে শেষ বৈপ্লবিক কর্মকান্ড চালান। ঢাকা অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর উভয় দলের সদস্য সূর্যসেন ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন-এর কাজ পরিচালনা করেন। এ ঘটনা সাংগঠনিক দিক ও শৌর্য-বীর্যে বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে অতুলনীয় ছিল। সূর্যসেনের বিচার হয় এবং ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তারিখে তাঁকে ফাঁসিতে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সূর্যসেনের যশ এবং সফলতা এমন এক সময়ে আসে যখন বিপ্লবী আন্দোলন তাঁর আদর্শ পরিবর্তন করে ফেলে এবং তা আংশিকভাবে কংগ্রেসের সাথে ও আংশিকভাবে সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। সূর্যসেনের ওই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের পর আর কোনো উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী কর্মকান্ডের কথা শোনা যায় নি।  [চিত্তরঞ্জন মিশ্র এবং মোহাম্মদ শাহ]