অধোগমন


অধোগমন (Subduction)  যে প্রক্রিয়ায় ভূত্বকীয় প্লেটসমূহ গুরুমন্ডলের উর্ধ্বাংশে অবনমিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তাকেই অধোগমন বলা হয়।

ভূত্বককে মহাসাগরীয় এবং মহাদেশীয় এই দুইভাগে ভাগ করা যায় এবং বৈশিষ্ট্যগতভাবে দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহাসাগরীয় ভূত্বক সাধারণত ৫-১০ কিমি পুরু এবং বেসল্ট, গ্যাবরো ও ডায়াবেজ জাতীয় শিলাসমূহ দ্বারা গঠিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে মহাদেশীয় ভূত্বক গঠিত হয় অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্বের শিলাসমূহ যেমন গ্রানাইট ইত্যাদি দ্বারা এবং এর পুরুত্ব ৩০-৫০ কিমি হয়ে থাকে। অগলিত এবং স্থিতিস্থাপক গুরুমন্ডলে সংঘটিত পরিচলন প্রক্রিয়ার কারণে ভূ-ত্বক খন্ড খন্ড হয়ে সঞ্চারণশীল ভূগাঠনিক প্লেটে  পরিণত হয়। দুটি মহাসাগরীয় প্লেট অথবা একটি মহাসাগরীয় প্লেট ও একটি মহাদেশীয় প্লেট মুখোমুখি অগ্রসর হলে অধোগমনের সৃষ্টি হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্লেট দুটি পরস্পর মিলিত হয়ে একটি লম্বালম্বি সম্প্রসারিত মন্ডলের সৃষ্টি করে যেখানে একটি প্লেট অপর প্লেটের নিচ দিয়ে অগ্রসর হয়। অধোগমন মন্ডলসমূহে সাধারণত মহাসাগরীয় মহীখাত, আগ্নেয় পর্বতমালা এবং ভূত্বকীয় বিকৃতি ঘটে পর্বতমালার সৃষ্টি করে। গভীর সামুদ্রিক মহীখাতসমূহ (deep oceanic trenches) হচ্ছে ভূপৃষ্ঠের সর্বাধিক সক্রিয় ভূ-গাঠনিক কাঠামো। আগ্নেয়গিরি দ্বীপমালা সংলগ্ন অঞ্চল এবং মহাদেশীয় প্রান্তদেশ বরাবর মহীখাতসমূহ গঠিত হয়ে থাকে। এ সকল খাতসমূহ একটি রৈখিক মন্ডলের সৃষ্টি করে এবং রৈখিক মন্ডল বরাবর গতিশীল মহাসাগরীয় প্লেটসমূহ নিশ্চল অথবা অপেক্ষাকৃত ধীর গতিসম্পন্ন মহাদেশীয় প্লেটের তলদেশ দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে এবং গুরুমন্ডলের উর্ধ্বস্তরের গভীরে ঢুকে গিয়ে নিঃশেষ অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। অধোগমন মন্ডলসমূহ স্বল্প মাত্রা, পরিমিত মাত্রা ও তীব্র মাত্রার ভূ-কম্পীয় কর্মকান্ড; ঋণাত্মক অভিকর্ষ বৈষম্য (negative gravity anomaly) এবং অত্যধিক নিম্ন তাপ প্রবাহ প্রভৃতি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। মহীখাত এলাকাসমূহে অধোগতি প্রাপ্ত মহাসাগরীয় প্লেটের বর্জিত পলল সঞ্চিত হতে থাকে এবং এ প্রক্রিয়ার ফলে সঞ্চিত পলিরাশি চাপের ফলে সংকুচিত ও উর্ধ্বমুখে উত্থিত হয়ে পর্বত গঠন করে।

উত্তরাভিমুখী চলন্ত ভারত মহাসাগরীয় প্লেট পাকিস্তান ও ইরানের মারাকান উপকূল বরাবর এবং জাভা-আন্দামান প্রান্তসীমা বরাবর অবস্থিত দুটি অধোগমন মন্ডলে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে। আন্দামান অধোগমন মন্ডল পাটকাই-নাগা আরাকান পর্বত গঠন বলয় বরাবর উত্তরাভিমুখী অগ্রসরমান যেখানে টারশিয়ারি পললের প্রাধান্য বিরাজমান। এ মন্ডলে অবস্থিত রয়েছে তিমুর-মেন্টাউই পাললিক দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বের বর্ধিতাংশ। আন্দামান-নিকোবার পাললিক দ্বীপমালা ক্রিটেশাস ফ্লিশ (সামুদ্রিক পাললিক শিলা), রেডিওলারিয়ান চার্ট (radiolarian chart) এবং পেলাজিক চুনাপাথর দ্বারা গঠিত। এ সকল উপাদান অফিওলাইট (কৃষ্ণাভ আগ্নেয় শিলা) এবং অফিওলাইটিক মেলাঞ্জ (opiolitic melange)- এর মধ্যে রোপিত এবং এ সবকিছুই টেনাসেরিম-মালয়েশিয়া বলয় থেকে উদ্ভূত ইওসিন থেকে অলিগোসিন ফ্লিশ ও নিওজিন অগভীর পানির পলল (neogene shallow water sediments) দ্বারা চাপা পড়েছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের গঠন কাঠামো পাটকাই-আরাকান পর্বতসারির গঠন কাঠামোর মতো খুবই সমরূপ এবং তা অত্যধিক বিকৃত পূর্বপার্শ্বীয় জঙ্ঘার (thrust) উপস্থিতি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যা অত্যধিক ঢালবিশিষ্ট সবেগে নিম্নমুখী গতিশীল প্লেট দ্বারা আবদ্ধ। এ প্লেট অফিওলাইটিক মিশ্রণ ও আলট্রামেফিকস (ultramafics) দ্বারা সীমা নির্দেশিত। সমুদ্র তলদেশের আপার ক্রিটেশাস অফিওলাইট ও পললসমূহ অধোগমনকারী ইন্ডিয়ান প্লেটের বর্জিতাংশকে উপস্থাপন করছে। আন্দামান-ইন্দোনেশীয় আর্কের ভূ-কম্পণজনিত কর্মকান্ড এ এলাকাকে দক্ষিণপশ্চিম থেকে উত্তরপূর্ব দিক পর্যন্ত বিস্তৃত অগভীর, মধ্যবর্তী ও তীব্র অধিকেন্দ্র বিশিষ্ট একটি সুগঠিত বেনিঅফ জোন (Benioff zone) হিসেবে নির্দেশ করছে। মিয়ানমার প্লেটের নিম্নে ভারতীয় প্লেটের পূর্বমুখী অধোগমনের কারণে বঙ্গীয় অববাহিকা ধীরে ধীরে ২৩০ কি.মি. প্রস্থবিশিষ্ট গিরিজনি বলয়, ইন্দোবার্মা পর্বতসারি দ্বারা অধিক্রান্ত হচ্ছে ইন্দোবার্মা পর্বত সারিতে অবস্থিত ভাঁজ ও ঠেলাচ্যুতিসমূহ উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত যা পূর্বমুখী অধোগমনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ভূমিকম্প সম্পর্কিত তথ্যাবলি অনুসারে মিয়ানমার প্লেটের নিচ দিয়ে ভারতীয় প্লেট উত্তরভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে।  [আ.স.ম উবাইদ উল্লাহ]