উদ্যানতত্ত্ব

উদ্যানতত্ত্ব  উদ্যানতত্ত্ব হচ্ছে সমন্বিত একটি বিষয়, মাটি থেকে বিভিন্ন প্রকার উৎপাদন এর অন্তর্ভূক্ত। সাধারণভাবে উদ্যানতত্ত্ব বলতে বাণিজ্যিক ভিত্তিক বাগান করা বুঝায় যাতে লাভের জন্য ফুল, ফল ও সবজি উৎপাদন করা হয়।

১৯০৫ সালে ভারতীয় কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ও আসাম প্রদেশে গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁওয়ে ১৯০৮ সালে একটি কেন্দ্রীয় কৃষি গবেষণা ল্যাবরেটরি স্থাপিত হয়। তখন কৃষি গবেষণা মূলত ধান, পাট, তুলা, তেলবীজ, ডাল এবং আখ নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। উদ্যানতাত্ত্বিক শস্যগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় নি। ১৯৩৮ সালে ঢাকায় বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে উদ্যানতত্ত্ব একটা শিক্ষনীয় বিষয় ছিল। তবে ব্রিটিশ ঔপনেবিশক শাসনামলে উদ্যানতত্ত্বের উন্নয়নে যথাযথ দৃষ্টি দেয়া হয় নি।

পাকিস্তান আমলে উদ্যানতত্ত্ববিদ ও কৃষি পরিচালক ড. রহিম চৌধুরীর উদ্যোগে উদ্যানতত্ত্বের উন্নয়নে কর্মসূচি গৃহীত হয়। এ সময় বরিশালের রহমতপুরে নারিকেল গবেষণা কেন্দ্র, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফল গবেষণা কেন্দ্র, সিলেটের জৈন্তাপুরে লেবু গবেষণা কেন্দ্র এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি গাছ প্রবর্তন কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ১৯৬২ সালে ময়মনসিংহে  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে প্রথম থেকেই ফল, সবজি, মসলা এবং সৌন্দর্যবর্ধক গাছের উপর গবেষণা চলছে এবং অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রির পাঠ্যসূচিতে উদ্যানতত্ত্ব বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যানতত্ত্বের উপর পিএইচ.ডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়।  বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফল ও সবজি সংগ্রহের পর সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর জয়দেবপুরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এদের মধ্যে প্রধান কেন্দ্র জয়দেবপুরে এবং চারটি আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে রহমতপুর (বরিশাল), হাটহাজারী (চট্টগ্রাম), আকবরপুর (মৌলভীবাজার) এবং নবাবগঞ্জে (রাজশাহী)। বর্তমানে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র নতুন জাতসহ সঠিক উৎপাদন পদ্ধতি উদ্ভাবনে ফল, সবজি, মসলা ও সৌন্দর্য্যবর্ধক গাছ নিয়ে গবেষণা করছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন হর্টিকালচারাল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, আগ্রহী ব্যক্তি, নার্সারীম্যান এবং কৃষি সম্প্রসারণের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের উদ্যানতত্ত্বের প্রাথমিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ১৯৮৩ সালে গাজীপুরের সালনায় স্নাতকোত্তর কৃষি শিক্ষার জন্য ইনস্টিটিউট অব পোস্ট-গ্রাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি উদ্যানতত্ত্বে এম.এসসি এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় এবং এর নামকরণ হয়  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় এবং এতে উদ্যানতত্ত্ব পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭৮ সালে পটুয়াখালীর দুমকিতে পটুয়াখালী কৃষি কলেজ এবং ১৯৮৮ সালে দিনাজপুরে হাজী দানেশ কৃষি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পটুয়াখালী ও দিনাজপুরের কলেজ দুটি এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়েছে যাতে কৃষি একটি অনুষদ হিসেবে পরিগণিত। বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট ২০০১ সালে শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। এসব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগগুলো শিক্ষাদানের পাশাপাশি উদ্যানতত্ত্বভিত্তিক শস্যের উপর বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অর্নামেন্টাল হর্টিকালচারের অংশ হিসেবে ফুলের চাষ দেশে যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করেছে। জরিপ থেকে দেখা গেছে, প্রতি ইউনিট ধান উৎপাদনে যে আয় হয় তার চেয়ে ফুল উৎপাদনে দ্বিগুণ আয় হয়। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ফুলের চাষকে রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গণ্য করে। ১৯৮৮ সাল থেকে ফুলের বাণিজ্য বিকাশ লাভ করেছে। উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ১৩৩টি গোলাপ ফুলের জাত, ৫৪টি গ্লাডিওলাস, দুটি রজনীগন্ধা ও ৩০টি চন্দ্রমল্লিকার জাত আছে। মিরপুরে  ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং বাংলাদেশ রাইফেলসের গার্ডেনে সংগৃহীত ২০০ গোলাপ জাত আছে। পাবলিক (বিএআরআই/ডিএই) এবং প্রাইভেট সেক্টর (ব্র্যাক, জার্মান কৃষি ফাউন্ডেশন এবং প্রশিকা) কয়েকটি টিস্যু ইউনিট মাইক্রোপ্রোপাগেশনের উপর কাজ শুরু করেছে।

অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মাথাপিছু ক্যালরি, প্রোটিন এবং অপরাপর পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ কম। ফল ও সবজির সরবরাহ লোকের পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফল এবং সবজি চাষ বাংলাদেশে এখনও বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠেনি। এগুলো মূলত জন্মায় গ্রামের বসতবাড়ির আশেপাশে। নিকট অতীতে কিছু কৃষকের মধ্যে ফল ও সবজির বাণিজ্যিকভিত্তিক চাষ গড়ে উঠেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিস্তারের সাথে সাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল ও সবজির চাষ কৃষকদের মধ্যে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটি উদ্যানভিত্তিক শস্য যেমন ফল, সবজি, আলু, ট্রপিকাল টিউবার শস্য, মাশরুম, অর্নামেন্টাল, ঔষধি এবং মসলা জাতীয় গাছ, বৃক্ষজাতীয় গাছ ও সুগন্ধযুক্ত গাছ ইত্যাদির জন্য উপযুক্ত। খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য দানাজাতীয় শস্যের উপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ভূমির সঠিক ব্যবহার করে কৃষিকে লাভজনক করার মাধ্যমে হর্টিকালচারাল ইন্ডাস্ট্রি দেশে কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। উদ্যানভিত্তিক শস্য উৎপাদন খুবই লাভজনক এবং তা দারিদ্র্যদূরীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে। এসব শস্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং জিডিপি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। উদ্যানতাত্ত্বিক শিল্প দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশে স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। [মোঃ আজিজুল হক]